বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৩

"চায়না" হতে চাই না!


ভৌগলিক আয়তনের মত বিশাল তার অর্থনীতি,কারো কাছে ঈর্ষণীয় কিংবা কারো কাছে অনুকরণীয় প্রবৃদ্ধি আর অফুরান তরুণ প্রাণ শক্তি-এই সবকিছু নিয়ে সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম একটি নিজ দেশের মহাপ্রাচীরের মত মহীরুহ হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না।সফলতা কি জিনিস আর কিভাবেই তা নিজের করে নিতে হয় তার উজ্জ্বল উদাহরণ এই লাল পতাকার দেশটি।শিল্প-অর্থনীতি থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা অথবা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ থেকে শুরু করে খেলার জগতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা-সবই যেন তাদের হাতের মোয়া।গত বেইজিং অলিম্পিক থেকে শুরু করে চলমান অলিম্পিকে নিজেদের কৃতিত্ব দেখিয়ে দিচ্ছে সারা দুনিয়াকে।যেন অমরত্ব ছাড়া আর কোন কিছুই আর তাদের জয় করার বাকি নেই।দ্রগবার মত নামি খেলোয়াড়কে চীনা লীগে ভিড়িয়ে ইতিমধ্যে বাকি ফুটবলারদের কাছে এই বার্তাই পাঠিয়ে দিল যে,অচিরেই আমরা বুড়ো ফুটবলারদের “অভয়াশ্রমে” পরিণত হচ্ছি।তাবৎ দুনিয়ার সব কর্পোরেট জায়ান্টরা এশিয়াতে ব্যবসা করতে চাইলে আগে চীনের কথা ভাবেন, ভাবেন চীনে একটা কারখানা খোলার,সেখানকার মার্কেটের কথা।গত কয়েক বছরে বাংলাদেশীরাও সেখানে পাড়ি জমাচ্ছে নিজেদের উচ্চশিক্ষার্থে।শিক্ষা(পড়ুন আদম)ব্যবসায়ীদের দাবি,সেখানকার পড়ালেখার মান নাকি বিশ্বমানের কিন্তু খরচ বাংলাদেশ থেকেও কম।সব দেখে শুনে নিজ দেশকে “চীনে” রূপান্তর করার কথা ভাবতে পারেন কেউ কেউ।সোনার হরিণ হয়তো থাকলে ঐ চীনেই থাকে।
সাদা চোখে দেখা এসব কিছু আপনাকে মুগ্ধ করে তাহলে একটু থামেন।পর্দার পিছনের ছবি যে এখনও আপনার সামনে আসেনি।চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনেক বিপুল একটা অংশের কৃতিত্ব চীনা তরুণদের।কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে,২০২৫ সাল নাগাদ ইন্ডিয়া চীনকে ছাড়িয়ে যাবে শুধু একটা কারণে। তা হচ্ছে চীনা সরকারের “এক সন্তান” নীতির কারণে।স্বভাবতই যে কেউ বলতে পারেন, জনসংখ্যা যখন ধেই ধেই করে বাড়তে থাকে,তখন সরকারেরই বা কি করার থাকে?নির্মম সত্য হচ্ছে চীনা সরকার তার এক সন্তান নীতি বাস্তবায়ন করে খুব কঠোর ভাবে।চীনে ভ্রূণ হত্যা খুব কমন একটা ব্যাপার।বাবা-মা’রা তাঁদের অনাগত সন্তানকে সামর্থ্য থাকার পরেও পৃথিবীর আলো দেখান না জরিমানা আর নিপীড়নের ভয়ে।যারা অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল তারা পাড়ি জমান পার্শ্ববর্তী হংকং এ।সন্তান জন্ম নেয় সেখানে,বেড়েও উঠে সেখানেই।তবে এই অবস্থায় ক্ষুব্দ হংকংবাসী।এর ফলে চাপ বাড়ছে সেখানকার হাসপাতাল গুলোর উপর।হংকং এর প্রসূতি সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে খুব মারাত্মক ভাবে।সরকারি তো বটেই বেসরকারি হাসপাতালের সিট ও চীনা হতে আগত মা’দের দখলে।ধনীরা তো তারপরও হংকং গিয়ে নিজেদের উত্তরাধিকার রাখতে পারছেন কিন্তু মানবেতর অবস্থায় আছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দল।চীনা কৃষি এখনও পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর হতে পারেনি।ফলে বাংলাদেশের কৃষকদের মত সেখানকার কৃষকরাও পুত্রসন্তানের আশায় দিন গোনেন।কিন্তু সরকার যে এক দম্পতির কোলে কেবল একটি সন্তানই দেখতে চায়।তাহলে একের অধিক সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি?হ্যাঁ,এরা আর দশটা শিশুর মত হেসে-খেলে বেড়ায়,বাড়ির কাজ কর্ম করে।কিন্তু এদের কোন পিতৃপরিচয় থাকে না।আর এর মানে হচ্ছে,এই শিশু মহান চীনের অংশ নয়।রাষ্ট্রের কোন সুযোগ সুবিধা তার জন্য নয়।সে পথের ধারে ফুটে থাকা নাম গোত্রহীন ফুল,যাকে কেউ হয়তো পছন্দ করে কিন্তু তুলে নিয়ে নিজ বাগানে লাগায় না-অনেকটা বাংলাদেশের টোকাইদের মত।
এক সন্তান নীতি পড়েই বিষিয়ে উঠলেন নাকি?অলিম্পিকে সোনা জয়ের পিছনের গল্পটা শুনবেন না?বলা নেই,কয়া নেই,হঠাৎ করে অলিম্পিকেও চীন এমন জায়ান্ট হয়ে উঠলো কিভাবে?এর পিছনে আছে কঠোর পরিশ্রম আর ভয়াবহ মানসিক চাপ-নির্যাতন।আশির দশকে থেকে শুরু হয় অলিম্পিকের স্বর্ণ-শিখরে উঠার প্রস্তুতি।দেশজুড়ে প্রাইমারি শিক্ষকরা পেলেন প্রতিভা অন্বেষণের।স্কুলপড়ুয়া এবং প্রকৃতিদত্ত প্রতিভার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে তুলে নেওয়া হয় তাদের পরিবারের কাছ থেকে। আর নির্দিষ্ট খেলায় দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনে রাখতে চীন দেশজুড়ে গড়ে তোলে তিন হাজার ট্রেনিং ক্যাম্প। আর এখানে সাঁড়াশি অনুশীলনে রেখেই নিজেদের প্রস্তুত করতে হয় চীনা শিশু-কিশোরদের। ট্রেনিং ক্যাম্পে নিষ্ঠুর অত্যাচারী আচরণের শিকার হতে হয় এসব শিশুকে। ক্যাম্পে শিশু-কিশোরের কান্নার খবর মিডিয়ায় প্রকাশও পায় পরে। চীনে অনুশীলন ক্যাম্পে ছোট ছোট শিশুর মগজ ধোলাই করা হয় নানা পন্থায়। ভবিষ্যতের এসব অ্যাথলেটের মাথায় ঢোকানো হয় প্রতিযোগিতায় মার্কিনিদের হারানোটাই তাদের পণ হওয়া উচিত। চীনা কর্তৃপক্ষের এ উন্মাদনাময় ট্রেনিং কৌশলে অতিষ্ঠ হলেও মুখ খোলার সাহস রাখতো না আগেরকার চীনা অ্যাথলেটরা। তবে চীনের এখনকার ক্রীড়াবিদরা ট্রেনিং কৌশল নিয়ে মন্তব্যে অনেকটাই সাহসী।অনুশীলন ক্যাম্পে ছোট ছোট শিশুদের মাথায় খেলাটিই ঘুরে ২৪ ঘণ্টা। দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে প্রস্তুতিটা এসব শিশুর কাছে হয় শারীরিকভাবেও বেদনাদায়ক। জিমন্যাস্টিকের নানা কসরতের উপযোগী করে তুলতে শিশুদের হাত পা মচকে দেয়া হয় ক্যাম্পের অনুশীলনে। আর সাঁতারে বড় সাফল্য কুড়াতে অনুশীলনও এসব প্রতিযোগীর কাছে শারীরিকভাবে কষ্টকর। সাঁতারের জন্য অধিক অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় একজন প্রতিযোগীর। আর চীনারা এর জন্যও রেখেছেন কষ্টদায়ক পদ্ধতি। পানিপূর্ণ সুইমিংপুলের বিশেষ কায়দায় প্রথমে শুষে নেওয়া হয় এর অক্সিজেন। পরে অক্সিজেন ঘাটতিতে থাকা পুলে সাঁতরাতে হয় চীনা সাঁতারুদের। অনুশীলনকালের এসব পদ্ধতি মিডিয়ার কাছে প্রকাশ করছেন চীনা তারকারাই।
ভাবছেন কমিউনিজমের দেশ,সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে এরা হয়তো যথেষ্ট উদার।আপনি যদি সচেতন পাঠক হন,তবে হয়তো পত্র-পত্রিকায় উইঘুর কিংবা তিব্বতি জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের কথা পড়েছেন।কিছুদিন পর পরই তিব্বতিরা নিজ ভূমির অধিকার চেয়ে গায়ে আগুন দিয়ে খবরের শিরোনাম হন।অবশ্য প্রকৃত অবস্থা অনুমান করা আরেকটু কঠিন বৈকি!মুক্ত মিডিয়ার যম হিসেবে চীনের "সুখ্যাতি" সারা দুনিয়া জুড়েই আছে।এমনকি সোশ্যাল নেটঅয়ার্কিং সাইটে নিয়ন্ত্রণের হাত বাড়াতে এদের দ্বিধা নেই। নিজের পাই টু পাই বুঝে নিতে জুড়ি নেই মাও সেতুং এর উত্তরাধিকারীদের।বিশ্বের সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণ কারী দেশগুলোর একটি হলেও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর প্রতি এদের ততটা মাথা ব্যাথা আছে বলে মনে হয় না।আর প্রতিবেশীকে শান্তিতে থাকতে দিবনা-এটা হয়তো তাদের জাতিগত কিরা-কসম!
সব মিলিয়ে আমার উপসংহার-চীন হয়তো আকর্ষণীয় তবে আমি একে পেতে চাই না।একপাশে চীন আর অন্যপাশে দুর্নীতি-দারিদ্র্য পীড়িত বাংলাদেশকে রাখলে আমি ঐ বাংলাদেশকেই চাইবো।আমি বরং পোড়া মরিচ আর পান্তা ভাত খেয়ে উন্নয়নের নতুন কোন রাস্তা খুঁজতে বের হব।
*শেষের আগে শুরুর কথাঃগতকালের পত্রিকায় চীনাদের শিশুদের উপর নিষ্ঠুর ক্রীড়া প্রশিক্ষণের কথা পড়ে শিউরে উঠি।মাথায় একে একে জমা হয় আগে পড়া কিছু খবরের কথা।সব একত্র করেই এই লেখা।আশা করছি পরেরবার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে উপযুক্ত সূত্র সহ লেখবার।এখানে উল্লেখ করা সবগুলো বর্ণনার বেশিরভাগই ইত্তেফাকের "আন্তর্জাতিক" সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র থেকে নেওয়া।সমস্যা হচ্ছে আমি সেগুলো বিভিন্ন সময় খণ্ড খণ্ড ভাবে পড়েছি ,যার ফলে অধিকাংশ লিঙ্কই আমার কাছে নেই।আর অলিম্পিকের খবরটা মূলত ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল সূত্রে পাওয়া যার অনুবাদ গত সাত তারিখ বাংলাদেশ প্রতিদিনের রকমারি পাতায় ছাপা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন