ছোটবেলায় কিশোর তারকালোক নামের একটা ম্যাগাজিনে বনবিবিকে নিয়ে একটা
গল্প পড়েছিলাম।বনবিবিকে সন্তুষ্ট না করে বরংঅবিশ্বাস করে বনে ঘুরতে যাওয়া
একদল অভিযাত্রীর কি করুণ পরিণতি হয়েছিল তারবর্ণনা।সে গল্প পড়ে শিউরে উঠে
ঠিক করেছিলাম কখনোই সুন্দরবন নামে ভয়ঙ্কর সুন্দর জায়গাটায় আমি যাব না।এই
ভয়ের কারণেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক,আমার আর সুন্দরবন বা দেশের চমৎকার
সব জায়গাগুলোতে আর যাওয়া হয়নি।নানা ফটো আর টিভিতে দেখেই চোখের
জ্বালামিটিয়েছি।হয়তো আর কখনোই যাওয়া হবে না সেখানে।যাওয়ার দরকারই বা
কি?বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত এত
‘গুরুত্বপূর্ণ’ একটা স্থাপনার জন্য কিছু জীবজন্তু,গাছপালা আর প্রাকৃতিক
বৈচিত্র্য উৎসর্গ করলেও তেমনএকটা ক্ষতি হবে না আশা করি!সুন্দরবন বিলুপ্ত
হলেও এর কিছু তথ্য জানার দরকারআছে।কারণ বিসিএস পরীক্ষা সহ বিভিন্ন পরীক্ষায়
বা সামনের প্রজন্মের কাছে গল্প করার রসদ হিসেবে এর অন্য রকম একটা আবেদন
আছে।এখন যেমন আমাদের দাদা দাদীরা পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরুর গল্প
করে,সেরকম আমরাও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আর চিত্রালি হরিণেরগল্প করবো।
১০০০০
বর্গ কিলোমিটার জায়গা নিয়ে গড়ে উঠা সুন্দরবনপৃথিবীর সব চাইতে বড়
ম্যানগ্রোভ বন যার ৬০ ভাগই বাংলাদেশে অবস্থিত।সুন্দরবনইএকমাত্র ম্যানগ্রোভ
বন যেখানে কিনা বাঘ আছে। প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন লোক এর উপরনির্ভরশীল।এর মধ্যে
আবার ৩২ ভাগের জীবিকার সাথে সুন্দরবন সরাসরি সংশ্লিষ্ট।১৯৮৭সাল থেকেই
সুন্দরবন ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত আর ১৯৬৬ সালথেকেই
বন্যপ্রাণীদের অভয়াশ্রম হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে।সুন্দরবনে আছে ২৭
প্রজাতিরম্যানগ্রোভ,২৭০ প্রজাতির পাখি,৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী,৫৩ প্রজাতির
সরীসৃপ,৮প্রজাতির উভচর,৪ প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ,১৫০ প্রজাতির
মাছ।বাংলাদেশে লোনা পানিরকুমির এখন কেবলমাত্র সুন্দরবনেই পাওয়া যায়।
বেশ
কয়েক বছর যাবতই আমরা শুনে আসছিলাম গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কথা।এর ফলে কিভাবে
ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সুন্দরবন?এর প্রভাবে সুন্দরবনের সামুদ্রিক জলস্তর বছরে
৩.১৪ মিমি করেবেড়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ৪টি দ্বীপ – সুপারিডাঙা, কাবাসগাছি,
বেডফোর্ড, লোহাচারা তো উপগ্রহের ছবি থেকেই মুছে গেছে। নতুন করে আয়লা বা
সিডর না এলেও, উষ্ণায়নের কারণে সেদিন জলস্তর প্রতি বছরে১ মিটার বাড়তে শুরু
করবে সেদিন এমনই জলের তলায় চলে যাবে আমাদের গর্বের সুন্দরবন।
তবে
প্রকৃতিকে সম্ভবত সুন্দরবনের উপর আরেকবার ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সুযোগ আমরা আর
দিচ্ছিনা।১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটা বিদ্যুতকেন্দ্র গড়ে উঠবে বাগেরহাটের
রামপালে যা কিনা সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে।এটি হতে যাচ্ছে
একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার জন্য বছরে প্রয়োজন হবে ৪৭ লক্ষ ২০
হাজার টন কয়লা। ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে
আমদানীকৃত এই কয়লা বোঝাই বড় বড়জাহাজ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পশুর নদীতে
চলাচল করবে ৫৯ দিন আর অগভীর অংশে কয়লাআনার জন্য ছোট লাইটারেজ জাহাজ চলাচল
করবে বছরে ২৩৬ দিন। এর অর্থ হচ্ছেবিদ্যুতকেন্দ্রটি তাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ
স্থানে হলেও এই কেন্দ্র সচল রাখতে সার্বিককাযক্রম চলবে সুন্দরবনের বুকের
উপর দিয়েই। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলেসুন্দরবনও যে নগরায়নের
আওতার মধ্যে চলে আসবে সে বিষয়েও ইংগিত করে বলা হয়েছে-যদি বিদ্যুৎ
ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় তবে বিভিন্ন সরকারী অফিস-আদালত এখানেস্থাপিত হবে
এবং শিল্প মালিকেরা এ অঞ্চলে আসতে আগ্রহী হবে।
হতাশার ব্যাপার
হচ্ছে, যে ভারতীয় ন্যাশনালথার্মাল পাওয়ার কোম্পানীর সাথে কেন্দ্র স্থাপনে
বাংলাদেশ চুক্তি করেছে সেই ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন এ্যাক্ট ১৯৭২
অনুযায়ী বাঘ-হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল,জাতীয় উদ্যান এবং জীব বৈচিত্র্যের জন্য
গুরূত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র
তৈরী করা যায় না।
যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের
পূর্বে পরিবেশগতসমীক্ষা রিপোর্ট বা ইআইএ আধুনিককালের অনিবার্য দলিল। এখানে
পরিবেশের উপর কোনপ্রকল্পের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ, প্রচ্ছন্ন-অপ্রচ্ছন্নসকল
প্রভাবের সত্যভাষণ তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে এই ইআইএ রিপোর্টের উপর ভিত্তি
করেইসিদ্ধান্ত হয় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে কি-না। কিন্তু বাগেরহাটের
রামপালে ২৬৪০মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটির ক্ষেত্রে চুক্তি সই,
জমি অধিগ্রহণ, জোর পূর্বক স্থানীয়দের উচ্ছেদইত্যাদি নানা
আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক মোড়কে কাজ শুরু হবার ২ বছর পর নিয়ম রক্ষারইআইএ
রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। ইআইএ এর মত একটা স্পর্শকাতর রিপোর্টে
যদি-তবে,হয়তোবা, আশা করা যায়, ধারণা করা হচ্ছে- এ জাতীয় আড্ডাবাজী
কথাবার্তার সুযোগ একেবারেই নেই।এই ইআইএ রিপোর্টের তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি
করেই ২০১১ সালে মালয়েশিয়ার সাবাহপ্রদেশে ৩০০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা
ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।ভারতের মধ্যপ্রদেশে ২০১০ সালে
বাতিল হয়েছে ১৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি প্রকল্প।
পৃথিবীতে
কয়লাভিত্তিক প্রকল্পব্যবস্থাপনায় দূষণমুক্ত প্রযুক্তি (clean coal
technology) বলতে কিছু নেই। ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটিকয়লাভিত্তিক
বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার টন বর্জ্য তৈরী করে। ইআইএ’তে বলা
হয়েছেবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার
পানি সংগ্রহকরে পরিশোধন করার পর পশুর নদীতে ৫১৫০ ঘনমিটার হারে নির্গমন করা
হবে। অথচ পরিবেশসংরক্ষণের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়লাভিত্তিক
বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুন্য নির্গমন(zerodischarge) নীতিঅনুসরণ করা হয়। এই
রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, গ্রীষ্মে নির্গত পানির তাপমাত্রা হবে৪০ ডিগ্রী
সেলসিয়াস এবং শীতকালে হবে ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। অথচ এক গবেষণায় দেখাগেছে
৩৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর অধিক তাপমাত্রায় মাছের বৈচিত্র্যতা আশংকাজনকভাবে
কমেযায়।
- এই ইআইএ রিপোর্টে সুন্দরবনের বাঘ
এবংহরিণের উপর নিশ্চিত ক্ষতিকর প্রভাব একেবারে অস্বীকার না করে তা ভবিষ্যৎ
নিরীক্ষণেরজন্য তুলে রাখা হয়েছে (Tigerand dear has been considered as an
Important Ecological Component to examineand evaluate the potential
impact of power plant).
- এই ইআইএ রিপোর্টে
দুর্লভ প্রজাতির স্বাদু পানির ডলফিন আর বিলুপ্তপ্রায় নোনাজলের কুমিরের
নাজুক অবস্থার কথা বলে এদের বিচরণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে আবার
অন্যদিকে সেই বিচরণক্ষেত্রের মধ্য দিয়েইহিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট
আর আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্তহাজারটনী ছোট-বড় জাহাজ চলাচলের
নৌরুট চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেই সাথে কয়লাপরিবহণকারী এসব জাহাজ থেকে
কয়লার গুড়া, টুকরা কয়লা, তেল, ময়লা আবর্জনা, জাহাজেরদূষিত পানিসহ বিপুল
পরিমাণ বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে।
-
এই পরিবেশগত সমীক্ষা রিপোর্টের একজায়গায় বলা হয়েছে, রামপাল এমন একটি
জায়গায় অবস্থিত যেখান থেকে নির্গত ধোয়া বা ছাইসুন্দরবনে “হয়তোবা পৌছাবে না” । আবার এই রিপোর্টেরই আরেক জায়গায় বলা হয়েছে নভেম্বর থেকেফেব্রুয়ারী মাসে চুল্লী নির্গত ধোয়া বা ছাই সুন্দরবনে “হয়তোবা পৌছাতে পারে।” এই ‘হয়তোবা’ এর মারপ্যাচে হলে কি হবে সে বিষয়টি চতুরতার সাথে এড়িয়ে যাওয়াহয়েছে।
-এই
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণকালে সাড়ে চারবছর ধরে প্রায় ৮ হাজার জন কাজ
করবে। এখান হতে প্রতিদিন যে ৮ টন বর্জ্য তৈরী হবেসেটির ব্যবস্থাপনার
ব্যাপারে এখানে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই। এ বিষয়েরিপোর্টে বলা
হয়েছে, বর্জ্য “হয়তোবা তৈরী হতে পারে।” যদি আমরা ধরে নেই যে দৈনিক
এই ৮ টন বর্জ্যের শেষ আশ্রয় হবে পাশেই বয়ে চলা পশুর নদী তবে সুন্দরবনে
বাস্তু-সংস্থানের কী ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে তা সহজেইঅনুমেয়।
-
ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে এই কেন্দ্র হতে বছরে৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও
২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। ক্রমাগতউৎপাদিত এই বিশাল পরিমাণ ছাই
কাজে লাগানোর (!) জন্য প্রথমে বলা হয়েছে প্রকল্প এলাকার ১৪১৪ একর জমি ভরাট
করার কথা। এরপর বলা হয়েছে সিমেন্ট কারখানা, ইটভাটায় ব্যবহার করারকথা।
এরপর বলা হয়েছে ছাই রপ্তানীর কথা। অথচ বড়পুকুরিয়ায় ২৫০
মেগাওয়াটবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিকটন ছাই
মারাত্নকভাবে পরিবেশ দূষণকরছে। ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পযন্ত চার বছরে ২ লক্ষ
৬০ হাজার টন ছাই পুকুরে জমা করেভরাট করে ফেলা হয়েছে। এই প্রকল্পেও ১০০
একরের একটি ছাইয়ের পুকুর তৈরীর কথা বলাহয়েছে, পশুর নদী থেকে যার দূরত্ব
হবে মাত্র ১২০ মিটার।এই বর্জ্য ছাই এর বিষাক্ত ভারী ধাতু বৃষ্টির পানির
সাথে মিশে কিংবা চুইয়ে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানিরস্তর এবং
পশুর নদীর সাম্ভাব্য ভয়াবহ দূষণ সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
গোটা
সুন্দরবনকে ঘিরে যখন এমন নীলনকশা প্রণয়নকরা হয়েছে তখন আমাদের মিডিয়া এক
রকম ঘুমিয়ে আছে বললেই চলে কিংবা খবরটাকে 'ব্ল্যাকআউট' করে রেখেছে।লুটেরাদের
সাথে তাদের গোপন কোন আঁতাতের আশংকা মনে আপনা থেকেই চলে আসে।এই ব্যাপারে
তেমন কোন খবর-বিশ্লেষণ বাআলোচনা আমার চোখে পড়েনি বললেই চলে।রাজনৈতিক
দলগুলোর আচরণ বরাবরের মতই হতাশাজনক।ক্ষমতার আর স্বার্থের লড়াইয়ে ব্যস্ত
তারা।এইদেশটা যেহেতু আমাদের,মাথাটাও তাই ঘামাতে হবে আমাদের।আরেকটা
গণজাগরণের অপেক্ষায় আছি।দেশ-মা-মাটি-প্রকৃতি রক্ষারএই জাগরণ ছাপিয়ে যাবে
অতীত সব ইতিহাসকে-সেই আশায় জেগে রইলাম।মনে রাখতে হবে আলবার্ট আইনস্টাইনের
সেই কথাটা-“পৃথিবী খারাপ মানুষের কাজের জন্য ধ্বংস হবে না, ধ্বংস হবে তাদের
জন্য যারা খারাপ মানুষের কাজ দেখে কিন্তু কিছু করে না”

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন