বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০১৩

জাপানে আত্মহত্যা, বাংলার ভবিষ্যৎ এবং একজন এনিমেশান শিল্পী

কাতাদা সান বেশ আবেগের সাথে কথা বলেন। কথা বলেন আনিমেশান নিয়ে। বলেন তাঁর ভালো লাগার আনিমেশানের কথা, তাঁর আনিমেশানের কর্ম জীবনের দীর্ঘ ৩০ বছরের কথা। জাপানের আনিমেশানের সাফল্যের পাশাপাশি জাপানের অর্থনৈতিক অবনতির কথা। জাপানের উন্নত জীবনের অন্তরালের ভয়াবহ দঃস্বপ্নময় জীবনের কথা। 
একদিন তিনি বলছিলেন, 
“টোকিওতে ‘ইয়ামানোতে সেন’ (একটি ট্রেন লাইন) এ চড়লে প্রায়ই একটা ঘোষনা আমরা শুনতে পায়।  
অমুক সময়ের অমুক ট্রেন অত মিনিট দেরী করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরী হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। .......”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন “বলুনতো,  দেরী হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই এর মানে কি?”


আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। বললাম হয়ত কোন ছোট খাট সমস্যাজনিত কারণে ট্রেন লেট করে ফেলেছে তাই এটা বলছে। তিনি বললেন, “না। কারণটা আসলে অনেক বড় এবং কারণটা প্রতিদিন ই ঘটছে এবং দিনে কয়েকবারও ঘটছে, কিন্তু সেটা আবার যন্ত্রের ত্রুটি বা রেল কতৃপক্ষের ত্রুটি জনিত কারণও নয়।  আসলে কারণটা ঘটায় সাধারণ মানুষ। বলতে পারবেন কারা?”’ 
আমি বলতে পারলাম না। 
তিনি বললেন, “আত্মহত্যাকারীরা”।
(জাপানে আত্মহত্যাকারীরা চলন্ত ট্রেনের নীচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।) 
বলে গানের সুরে সুরে ট্রেনের ঘোষনাটা আবার আওড়াতে থাকলেন। তাকে একটু হতাশ মনে হল। 
আমি একটু সমবেদনা দেখাবার জন্যে বলতে থাকলাম “সত্যিই। জাপানে এত আত্মহত্যা করে সবাই; আমার খুব খারাপ লাগে।” 
আমার এক গায়িকা বান্ধবীও যে গত বছর আত্মহত্যা করেছে সে কথাও তাকে বললাম। এছাড়া ওইখানের স্কুল জীবনের কতগুলো হতাশাগ্রস্ত বন্ধু ও বান্ধবীদেরকে নিয়েও যে আমি একটু শঙ্কিত তাও তাকে বললাম। বললাম আসলে টাকা না থাকলে জাপানের জীবন অনেক কঠিন, তাই না? 
তিনি বললেন, “ঠিক তাই, শিপু ভাই। আপনার যদি টাকা না থাকে তাহলে জাপান হয়ে যাবে আপনার জন্যে দোযখ। না পারবেন ঘুমিয়ে থাকতে, না পারবেন জেগে থাকতে। ২৪ ঘন্টা আপনাকে দৌড়াতে হবে টাকা রোজগারের পিছনে”। 
তিনি বলতে থাকলেন... 
“আজকে আপনারা মনে করছেন যে, জাপানীরা না জানি কত বড়লোক, কত সুখী। কিন্তু না। না। আপনাদের ধারণা সম্পূর্ণভাবে ভুল। সাধারণ জাপানীদের হাতে কোন টাকা নেই, আছে শুধু লোনের বোঝা আর পরিশোধের চাপ। সুখী থাকবে কিভাবে। আপনাদের তো এখনও লোনের বোঝা সেভাবে হয়ে ওঠেনি। আপনারা তো এখনো আমাদের মত তথাকথিত উন্নত জীবন-কারাগারে বন্দী হননি। তাই আপনাদের এখনও প্রতিদিন, এবং মাসের শেষে বিভিন্ন ধরণের বিল পরিশোধের টাকা গুনতে হয়না। আপানারা এখনও স্বাধীন। তাই আপনারা চাইলে মাঠে ঘুমিয়েও ২/৩ বেলা খেয়ে না খেয়েও জীবনটা পার করে দিতে পারবেন। কিন্তু আমরা জাপানীরা পারবোনা। আমাদের সে সামাজিক সাধীনতা নেই। না চাইলেও আমাদের ইমারতের মধ্যেই বসবাস করতে হয় এবং তার জন্য ভাড়া দিতেই হয়। ফ্লাট ভাড়া করতে গিয়ে ইন্স্যুরেন্স, গ্যারান্টী, ইত্যাদি বিষয়ক অনেক কাগজ জোগাড় করতে হয়। ভাড়া জোগাড় করতে গিয়ে কাজ করতে হয়। কাজ করতে হলে খেতে হয়। ৩ বেলা না চাইলেও অন্তত ২ বেলা অবশ্যই খেতে হয় এবং তার জন্য টাকাও গুনতে হয়। কারণ না খেলে কাজ করতে পারবো না। এর পরে আছে সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে প্রয়োজনের পাহাড়। পোষাক আশাক আরও কত কি। তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে আপনি সবার চোখে হয়ে যেতে থাকবেন একজন এলিয়েন। যা জাপানে বসবাসের জন্য ভয়াবহ। কারণ জাপানীরা এলিয়েন পছন্দ করেনা। তারা সবাইকে একই রকম দেখতে চায়। এবং আপনি সেভাবে সমাজের সাথে মেলাতে গিয়ে দেখবেন এক সময় আর পেরে উঠছেন না। আপনি রোজগারের জন্যে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় শারিরিক ভাবে এবং মানসিক ভাবে ক্লান্ত হতে থাকবেন। আপনি আবিষ্কার করবেন যে, আপনি সামাজিক ভাবে চলতে গিয়ে বিভিন্ন রকম বিল  (অধিকাংশ জিনিষই আপনি সেখানে কিস্তিতে কিনতে পারবেন) পরিশোধ করতে গিয়ে আপনার কাজের সময়ের পরিমান আরো বাড়াতে হচ্ছে প্রতিদিন। একসময়ে আবিষ্কার করবেন যে, সারাদিন আপনি দাসের মত খাটছেন এবং রোজগারের জন্য যে কাজ করছেন তা আপনার পছন্দের কাজ নয়; এবং আপনি সে কজে আনন্দ তো পাচ্ছেনই না বরং কষ্ট পাচ্ছেন। এরপর যা হবে তা এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মত। আপনার আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে আপনি যাবেন। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে আপনার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদারদেরকে আপনার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু আপনি এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন না বা সে সুযোগও আপনাকে দেয়া হবে না। আপনি হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবেন। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা আপনার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে আপনি আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেন না। আপনি হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবেন। নীজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবেন। লাফিয়ে পড়বেন ইয়ামানোতে সেনের ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে আরো একটা ঘোষনা হবে। 
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরী করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরী হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >.......”
কথা গুলো বলতে বলতে জাপানের টেলিভিশান এবং সিনেমা হলের জন্য নির্মিত অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী গল্পের আনিমেটর কাতাদার চোখ দুটো চিক চিক করে উঠল।

 


আমি বললাম তাহলে আমরা কি ভালো আছি?  আমাদেরও তো এখন ঢাকা শহরে বসবাস করতে অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমদেরও তো আনেক কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি বললেন হ্যা,আপনাদেরও অনেক খরচের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তবে আমাদের ধারে কাছেও এখনও পৌঁছাতে পারেননি আপনারা। ঢাকা শহরেও আপনারা চাইলে স্বাধীনভাবে অথবা খরচ না করেও জীবন যাপন করতে পারবেন এখনও। আর গ্রামে গেলে তো আরো চাহিদা কম। আপনি চাইলে অল্প কাজ করে, অল্প খেয়ে পরে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করেও আপনার জীবনটাকে পার করে দিতে পারবেন।
কিন্তু আপনাদের সমস্যা হচ্ছে, আপনারাও আমাদের মত ভূল করতে শুরু করেছেন। আপনারাও চাইছেন আমাদের মত ব্যায়বহুল জীবনযাপন করতে। আপনারা আমাদের মত দেশের (যেমন জাপান, আমেরিকা, ইউরোপ, ইত্যাদি দেশকে) অনুকরণ করে ঢাকা শহরকে একটা ব্যায়বহুল শহরে পরিণত করে সুখী হতে চাচ্ছেন।
কিন্তু আপনারা আসলে আমাদের মতই ভূল করছেন। এখন ঢাকা শহরে অনেক গুলো শপিং মল হয়েছে। ভিতরে ঢুকলে তথাকথিত উন্নত দেশের সাথে এগুলোর তেমন বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়না। এর কিছু দিন পরে দেখবেন আপনাদের দেশে Kiosk, Jusco ইত্যাদি আরও সব বড় বড় শপিং মল ঢুকে পড়বে এবং তারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়। এরা আপনাদের সব ছোট ছোট দোকান পাট, ব্যাবসা ইত্যাদিকে খেয়ে ফেলে দিবে। ফলাফল, আস্তে আস্তে আপনাদের সাধারণ মানুষের হাতে আর ব্যবসা থাকবে না। আপনারা ক্রমান্বয়ে হতে থাকবেন শুধু তাদের ব্যবসার জ্বালানির মসলা। আপনারা তাদেরকে মাথায় তুলে রাখার জন্য তথা কথিত উন্নত জীবন যাপনের নামে শুধু তাদের ব্যবহারের বস্তু হয়ে পড়বেন। আপনারা তাদের দ্রব্য তৈরী ও ক্রয় দুটোই করবেন।
তবে এখনই আপনাদেরকে ঐ ভয়াবহতার মধ্যে পড়তে হবেনা। এখন বরং আপনারা অনেক সুখী আছেন। কারণ এখন সেই সমাজ গড়ার প্রক্রিয়ার মধে আছেন আপনারা। প্রতিদিন আপনাদের একটু একটু করে রোজগারের টাকার অঙ্ক বাড়ছে, একটু একটু করে একেকটা যন্ত্রের অধিকারী হচ্ছেন। একটা ফ্রিজের, একটা ইলেক্ট্রিক ওভেনের মালিক হচ্ছেন, একটা সুন্দর শপিং মলে তথাকথিত আধুনিক পদ্ধতিতে কেনাকাটা করার সুযোগ পাচ্ছেন, কিছুদিন পরে গাড়ী বাড়ী, রাস্তা ঘাট সব কিছুরই অধিকারী হবেন তাও একটু একটু বুঝতে পারছেন। ফলে আপনাদের স্বপ্ন আছে। এবং সেই স্বপ্নই আপনাদেরকে এখন সুখে রেখেছে। 
কিন্তু তারপর আসবে সেই সময়, হয়ত আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম অপেক্ষা করছে আপনাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তাদের আর কোন কিছু পাওয়ার স্বপ্ন থাকবেনা, থাকবে শুধু দুঃস্বপ্ন। সবই তারা পেয়ে যাবে। আপনারা যেমন চেয়েছিলেন ঠিক তেমন দেশই তারা পাবে। তাদের গাড়ী, বাড়ী, ওয়াশিং ম্যাশিন, রাস্তা ঘাট সবই থাকবে। গলায় বিদেশীদের মত টাইও থাকবে। কিন্তু সেই টাই হয়ে যাবে তাদের গলার ফাঁস। আপনারা যে জীবনটা পাওয়ার জন্য একসময় স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদেরকে সেই জীবনে বসবাস করতে বাধ্য করা হবে। তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ আধুনিক ইমারতে বসবাস করতে, তাদেরকে বাধ্য করা হবে তথাকতিথ শপিং মলে কেনাকাটা করতে, এবং সর্বপরি তাদেরকে বাধ্য করা হবে ঐ সবের সমস্ত ব্যায়ভারও বহন করতে। এবং তারপর যা হবে তা ঠিক এখন যেমন হচ্ছে আমাদের মত দেশ গুলোতে...
...তাদের আর কাজে যেতে ইচ্ছে করবেনা, তারপরও বাধ্য হয়ে তারা যাবে। কাজে গিয়ে কর্মস্থলের মানুষদেরকে তার খারাপ লাগতে শুরু হবে। দোকানদার, পাওনাদার দেরকে তার খারাপ লাগতে থাকবে, কিন্তু সে এসব কিছুই প্রকাশ করার সুযোগ পাবেনা বা সে সুযোগও তাকে দেয়া হবে না। সে হতাশার অতলতায় ক্রমশ ডুবতে থাকবে। এক সময় হয়ত এমন কিছু ঘটনা তার সামনে এসে দাড়াতে থাকবে যে সে আর মোকাবেলা করার শক্তিও পাবেনা। সে হতাশার ঘোরের মধ্যে আরো তলিয়ে যেতে থাকবে। নীজের জীবনকে অদৃশ্য করে পালিয়ে বাঁচতে চাইবে। লাফিয়ে পড়বে ইয়ামানোতে সেনের মত কোন এক ট্রেনের নীচে। তারপর ট্রেনে একটা ঘোষনা হবে। 
< ...... সময়ের ...... ট্রেন ...... মিনিট দেরী করে ফেলেছে। অত্যন্ত দুঃক্ষিত। দেরী হওয়ার পিছনে বিশেষ কোন কারণ নেই। >.......”

 (ট্রেনের নীচে আত্মহত্যা করলে কোন কষ্ট ছাড়া মৃত্যু হবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। গবেষকদের মতে ট্রেনের নীচে শরীর কেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও সত্যিকারের মৃত্যু হতে কমপক্ষে ২ ঘন্টা সময় লাগে এবং ঐ ২ ঘন্টা কল্পনাতীত যন্ত্রনা ঐ আত্মহত্যাকারীকে সহ্য করতে হয়।)

বেশ কিছুক্ষন নীরব হয়ে বসে থাকলেন আনিমেটর কাতাদা। একসময় আবার ছবি আঁকতে শুরু করলেন।
আমি ভাবতে থাকলাম; জীবনের উন্নতি, সমাজের উন্নতি, দেশ, নদী নালা, রঙ্গীন ধান ক্ষেত, হলুদ সর্ষের ক্ষেত, ঢাকা শহরের মিশে যাওয়া খাল বিল, শিমুল ফুলের গাছ, রাতের শিয়ালের ডাক, ভর দুপুরের পাখীর গান, টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ, মুড়ি, সর্ষের তেল আর দেশী পিঁইয়াজের ঝাঁঝ, ... 
...আর বাবার কলমের কালি এবং মায়ের সেলাইয়ের সুঁতা দিয়ে স্কুলের খাতার মধ্যে হরেক রকম ডিজাইন তৈরী করে ছোট বোনকে আনন্দ দেয়ার কথা।  
হঠাৎ করে জানালার ওপাশ থেকে মটর সাইকেলের বিকট হর্ণের শব্দে আমার স্বপ্নের ঘোর কেটে গেল। জানালা খুলতেই দেখলাম অসংখ্য মানুষ,  অসংখ্য গাড়ী। একে অপরকে সরে যেতে বলছে, রিক্সাওয়ালাকে ট্রাফিক পেটাচ্ছে, গাড়ীর ড্রাইভার গাড়ী থেকে নেমে পথচারীর কলার চেপে ধরেছে, ফুটপাথে এক মটর সাইকেল পথচারীদেরকে ধমক দিতে দিতে সামনে এগিয়ে চলেছে। ...... 
...একটি ছোট্ট ছেলে মুখে হাত দিয়ে ফুটপাথে বসে কি যেন ভাবছে ......... ...
...... ...
কৃতজ্ঞতাঃ- এ এফ এম 'শিপু' মনিরুজ্জামান  http://www.shapludu.com/1417/6/article02.php

সোমবার, ২৭ মে, ২০১৩

ওরিয়ানা ফালাচির নেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার

(ব্লগে ওরিয়ানা ফালাচির নেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়া অনেক কথা হইছে। অনেক নিন্দা করা হইছে তাকে। কিন্তু আমার ধারণা খুব কম ব্লগারই সাক্ষাৎকারটি পড়েছেন। আমি ও ব্রাত্য রাইসু যখন যায়যায়দিন পত্রিকায় কাজ করতাম তখন ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে ওরিয়ানা ফালাচির ওপর একটি সংখ্যা প্রকাশ করছিলাম। সেই সংখ্যায় ফালাচির নেওয়া মুজিবের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হইছিল। সাক্ষাৎকারটি পুরাটা স্থান অভাবে প্রকাশ করা যায় নাই। সাক্ষাৎকারটির যায়যায়দিনে প্রকাশিত অংশের সফট কপি আমার কাছে আছিল। সেইটা এইখানে পোস্ট করলাম। ওরিয়ানা ফালাচি ২০০৬ এর ১৫ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। সাক্ষাৎকারটি নেয়া হইছিল আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর অনুবাদ করা ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি বই থেকে। ফালাচি সাক্ষাৎকার নিছিলেন ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারিতে।)

রবিবার সন্ধ্যা : আমি কলকাতা হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেছি। সত্যি বলতে কি, ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাদের বেয়নেট দিয়ে যে যজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর পৃথিবীতে আমার অন্তিম ইচ্ছা এটাই ছিল যে, এই ঘৃণ্য নগরীতে আমি আর পা ফেলবো না। এ রকম সিদ্ধান্ত আমি নিয়েই ফেলেছিলাম। কিন্তু আমার সম্পাদকের ইচ্ছা যে, আমি মুজিবের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। ভুট্টো তাকে মুক্তি দেয়ার পর আমার সম্পাদকের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল। তিনি কি ধরনের মানুষ? আমার সহকর্মীরা স্বীকৃতি দিল, তিনি মহান ব্যক্তি, সুপারম্যান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দেশকে সমস্যামুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করতে পারেন।
আমার স্মরণ হলো, ১৮ ডিসেম্বর আমি যখন ঢাকায় ছিলাম, তখন লোকজন বলছিল, ‘মুজিব থাকলে সেই নির্মম, ভয়ঙ্কর ঘটনা কখনোই ঘটতো না। মুজিব প্রত্যাবর্তন করলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না’। কিন্তু গতকাল মুক্তিবাহিনী কেন আরো ৫০ জন নিরীহ বিহারিকে হত্যা করেছে? ‘টাইম’ ম্যাগাজিন কেন তাকে নিয়ে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে হেডলাইন করেছে? আমি বিস্মিত হয়েছি, এই ব্যক্তিটি ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে সাংবাদিক অ্যালডো শানতিনিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার দেশে আমি সবচেয়ে সাহসী এবং নির্ভীক মানুষ, আমি বাংলার বাঘ, দিকপাল ... এখানে যুক্তির কোনো স্থান নেই ...।’ আমি বুঝে উঠতে পারিনি, আমার কি ভাবা উচিত।
সোমবার বিকাল : আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এবং আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দ্বিগুণের অধিক। ঘটনাটা হলো, আমি মুজিবকে দেখেছি। যদিও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। সাক্ষাৎকার নেয়ার আগে তাকে একনজর দেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এই কয়েকটা মুহূর্তই আমার চিত্তকে দ্বিধা ও সংশয়ে পূর্ণ করতে যথেষ্ট ছিল। যখন ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করি, কার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল? তিনি আর কেউ নন, মি. সরকার। আমার শেষবার ঢাকা অবস্থানকালে এই বাঙালি ভদ্রলোক আমার দোভাষী ছিলেন। তাকে দেখলাম রানওয়ের মাঝখানে। আমি ভাবিনি, কেন? সম্ভবত এরচেয়ে ভালো কিছু তার করার ছিল না। আমাকে দেখামাত্র জানতে চাইলেন, আমার জন্য তিনি কিছু করতে পারেন কি না? তাকে জানালাম, তিনি আমাকে মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি সোজা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন এবং পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা একটা গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম। গেটে মেশিনগানধারী মুক্তিবাহিনীর কড়া প্রহরা। আমরা রান্নাঘরে প্রবেশ করে দেখলাম, মুজিবের স্ত্রী খাচ্ছেন। সঙ্গে খাচ্ছে তার ভাগনে ও মামাতো ভাইবোনেরা। একটা গামলায় ভাত-তরকারি মাখিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মুখে পুরে দিচ্ছে সবাই। এ দেশে খাওয়ার পদ্ধতি এ রকমই। মুজিবের স্ত্রী আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন।
ঠিক তখনই মুজিব এলেন। সহসা রান্নাঘরের মুখে তার আবির্ভাব হলো। তার পরনে এক ধরনের সাদা পোশাক, যাতে আমার কাছে তাকে মনে হয়েছিল একজন প্রাচীন রোমান হিসেবে। পোশাকের কারণে তাকে দীর্ঘ ও ঋজু মনে হচ্ছিল। তার বয়স একান্ন হলেও তিনি সুপুরুষ। ককেশীয় ধরনের সুন্দর চেহারা। চশমা ও গোফে সে চেহারা হয়েছে আরো বুদ্ধিদীপ্ত। যে কারো মনে হবে, তিনি বিপুল জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি স্বাস্থ্যের অধিকারী।
আমি সোজা তার কাছে গিয়ে পরিচয় পেশ করলাম এবং আমার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলাম। মি. সরকার ভূমিতে পতিত হয়ে মুজিবের পদচুম্বন করলেন। আমি মুজিবের হাতটা আমার হাতে নিয়ে বললাম, ‘এই নগরীতে আপনি ফিরে এসেছেন দেখে আমি আনন্দিত, যে নগরী আশঙ্কা করছিল যে আপনি আর কোনোদিন এখানে ফিরবেন না।’ তিনি আমার দিকে তাকালেন একটু উষ্মার সঙ্গে। একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, ‘আমার সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলো।’
আমার দ্বিধা ও সন্দেহের কারণ উপলব্ধি করা সহজ। মুজিবকে আমি জেনে এসেছি একজন গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী হিসেবে। যখন আমি দম নিচ্ছিলাম, একজন যুবক আমার কাছে এসে বললো, সে ভাইস সেক্রেটারি। বিনয়ের সঙ্গে সে প্রতিশ্রুতি দিল, বিকাল চারটার সময় আমি ‘সরকারি বাসভবনে’ হাজির থাকতে পারলে আমাকে দশ মিনিট সময় দেয়া হবে। তার সঙ্গে যারা সাক্ষাৎ করতে চায় তাদের সঙ্গে সেখানেই তিনি কথা বলেন। বিকাল সাড়ে তিনটায় নগরী কান্ত, নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত মধ্যাহ্নের বিশ্রাম নিচ্ছে। রাস্তায় কাধে রাইফেল ঝুলানো মুক্তিবাহিনী টহল দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এখনো তাদের হাতে অস্ত্র আছে। তারা রাত-দিন টহল দেয়। এলোপাতাড়ি বাতাসে গুলি ছোড়ে এবং মানুষ হত্যা করে। হত্যা না করলে দোকানপাট লুট করে। কেউ তাদের থামাতে পারে না, এমনকি মুজিবও না। সম্ভবত তিনি তাদের থামাতে সক্ষম নন। তিনি সন্তুষ্ট এজন্য যে, নগরীর প্রাচীর তার পোস্টার সাইজের ছবিতে একাকার। মুজিবকে আমি আগে যেভাবে জেনেছিলাম, তার সঙ্গে আমার দেখা মুজিবকে মেলাতে পারছি না।
সোমবার সন্ধ্যা : আমি যে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি এটা ছিল একটা দুর্বিপাক। তার মানসিক যোগ্যতা সম্পর্কে আমার সন্দেহ ছিল। এমনকি হতে পারে যে, কারাগার এবং মৃত্যু সম্পর্কে ভীতি তার মস্তিষ্ককে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে? তার ভারসাম্যহীনতাকে আমি আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারি না। একই সময়ে আমি বলতে চাচ্ছি, কারাগার এবং মৃত্যুর ভয় ইত্যাদি... সম্পর্কে কাহিনীগুলো... আমার কাছে এখনো খুব স্পষ্ট নয়। এটা কি করে হতে পারে যে, তাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হলো, সে রাতে সব পর্যায়ের লোককে হত্যা করা হলো? কি করে কি করে এটা হতে পারে যে, তাকে কারাগারের একটি প্রকোষ্ঠ থেকে পলায়ন করতে দেয়া হলো, যেটি তার সমাধিসৌধ হতো? তিনি কি গোপনে ভুট্টোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিলেন? আমি যতো তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, ততো মনে হয়েছে, তিনি কিছু একটা লুকাচ্ছেন। এমনকি তার মধ্যে যে সার্বক্ষণিক আক্রমণাত্মক ভাব, সেটাকে আমার মনে হয়েছে আত্মরক্ষার কৌশল বলে।
ঠিক চারটায় আমি সেখানে ছিলাম। ভাইস সেক্রেটারি আমাকে করিডোরে বসতে বললেন, যেখানে কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোকে ঠাসাঠাসি ছিল। তিনি অফিসে প্রবেশ করে মুজিবকে আমার উপস্থিতি সম্পর্কে জানালেন। আমি একটা ভয়ঙ্কর গর্জন শুনলাম এবং নিরীহ লোকটি কম্পিতভাবে আবার আবির্ভূত হয়ে আমাকে প্রতীক্ষা করতে বললেন। আমি প্রতীক্ষা করলাম, এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা, চার ঘণ্টা; রাত আটটা যখন বাজলো, তখনো আমি সেই অপরিসর করিডোরে অপেক্ষমাণ। রাত সাড়ে আটটায় আমাকে প্রবেশ করতে বলা হলো। আমি বিশাল এক কক্ষে প্রবেশ করলাম। একটি সোফা ও দুটো চেয়ার সে কক্ষে। মুজিব সোফার পুরোটায় নিজেকে বিস্তার করেছেন এবং দুজন মোটা মন্ত্রী চেয়ার দুটো দখল করে বসে আছেন। কেউ দাড়ালো না। কেউ আমাকে অভ্যর্থনা জানালো না। কেউ আমার উপস্থিতিকে গ্রাহ্য করলো না। মুজিব আমাকে বসতে বলার সৌজন্য প্রদর্শন না করা পর্যন্ত সুদীর্ঘক্ষণ নীরবতা বিরাজ করছিল। আমি সোফার ক্ষুদ্র প্রান্তে বসে টেপ রেকর্ডার খুলে প্রথম প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু আমার সে সময়ও ছিল না। মুজিব চিৎকার শুরু করলেন, ‘হারি আপ, কুইক, আন্ডারস্ট্যান্ড? নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। ইজ দ্যাট কিয়ার?... পাকিস্তানিরা ত্রিশ লক্ষ লোক হত্যা করেছে, ইজ দ্যাট কিয়ারÑ আমি বললাম, ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার...।’ মুজিব আবার চিৎকার শুরু করলেন, ‘ওরা আমার নারীদেরকে তাদের স্বামী ও সন্তানদের সামনে হত্যা করেছে। স্বামীদের হত্যা করেছে তাদের ছেলে ও স্ত্রীর সামনে। মা-বাপের সামনে ছেলেকে, ভাইবোনের সামনে ভাইবোনকে ... ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার... আমি বলতে চাই...’
‘তোমার কোনো কিছু চাওয়ার অধিকার নেই, ইজ দ্যাট রাইট?’
‘আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো। কিন্তু একটা বিষয় সম্পর্কে আমি আরো কিছু জানতে চাই।’ বিষয়টা আমি বুঝতে পারছিলাম না। ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, গ্রেফতারের সময় কি আপনার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল।’
‘নো, ম্যাডাম নো। তারা জানতো, ওতে কিছু হবে না। তারা আমার বৈশিষ্ট্য, আমার শক্তি, আমার সম্মান, আমার মূল্য, বীরত্ব সম্পর্কে জানতো, আন্ডারস্ট্যান্ড?’
‘তা বুঝলাম। কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন যে তারা আপনাকে ফাসিতে ঝোলাবে? ফাসিতে ঝুলিয়ে কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়?’
‘নো, নো ডেথ সেনটেন্স।’
এই পর্যায়ে তাকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো এবং তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন, ‘আমি এটা জানতাম। কারণ ১৫ ডিসেম্বর ওরা আমাকে কবর দেয়ার জন্য একটা গর্ত খনন করে।’
‘কোথায় খনন করা হয়েছিল সেটা?’
‘আমার সেলের ভেতরে।’
‘আমাকে কি বুঝে নিতে হবে যে গর্তটা ছিল আপনার সেলের ভেতরে?’
‘ইউ মিস আন্ডারস্ট্যান্ড।’
‘আপনার প্রতি কেমন আচরণ করা হয়েছে মি. প্রাইম মিনিস্টার?’
‘আমাকে একটা নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। এমনকি আমাকে সাক্ষাৎকারের অনুমতি দেয়া হতো না, সংবাদপত্র পাঠ করতে বা চিঠিপত্রও দেয়া হতো না, আন্ডারস্ট্যান্ড?’’
‘তাহলে আপনি কি করেছেন?’
‘আমি অনেক চিন্তা করেছি, পড়াশোনা করেছি।’
‘আপনি কি পড়েছেন?’
‘বই এবং অন্যান্য জিনিস।’
‘তাহলে আপনি কিছু পড়েছেন।’
‘হ্যা, কিছু পড়েছি’।
‘কিন্তু আমার ধারণা হয়েছিল, আপনাকে কোনো কিছুই পড়তে দেয়া হয়নি।’
‘ইউ মিস আন্ডারস্টুড।’
‘তা বটে মি. প্রাইম মিনিস্টার। কিন্তু এটা কি করে হলো যে, শেষ পর্যন্ত ওরা আপনাকে ফাসিতে ঝোলালো না।’
‘জেলার আমাকে সেল থেকে পালাতে সহায়তা করেছেন এবং তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন।’
‘কেন, তিনি কি কোনো নির্দেশ পেয়েছিলেন?’
‘আমি জানি না। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমি কোনো কথা বলিনি এবং তিনিও আমার সঙ্গে কিছু বলেননি।’
‘নীরবতা সত্ত্বেও কি আপনারা বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন?’
‘হ্যা, আমাদের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আমাকে সাহায্য করতে চান।’
‘তাহলে আপনি তার সঙ্গে কথা বলেছেন?’
‘হ্যা, আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি।’
‘আমি ভেবেছিলাম, আপনি কারো সঙ্গেই কথা বলেননি।’
‘ইউ মিস আন্ডারস্টুড।’
‘তা হবে মি. প্রাইম মিনিস্টার। যে লোকটি আপনার জীবন রক্ষা করলো আপনি কি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন না?’
‘এটা ছিল ভাগ্য। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি।’
এরপর তিনি ভুট্টো সম্পর্কে কথা বললেন। এ সময় তার কথায় কোনো স্ববিরোধিতা ছিল না। বেশ সতর্কতার সঙ্গেই বললেন তার সম্পর্কে। আমাকে মুজিব জানালেন, ২৬ ডিসেম্বর ভুট্টো তাকে খুজতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে নেয়া। তার ভাষায়, ‘ভুট্টো একজন ভদ্রলোকের মতোই ব্যবহার করলেন। তিনি সত্যিই ভদ্রলোক।’ ভুট্টো তাকে বলেছিলেন, একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য মুজিব ব্লাকআউট ও যুদ্ধ বিমানের গর্জন থেকে বরাবরই যুদ্ধ সম্পর্কে আচ করেছেন। ভুট্টো তার কাছে আরো ব্যাখ্যা করলেন যে, এখন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং তার কাছে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চান।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘কি প্রস্তাব মি. প্রাইম মিস্টার?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘হোয়াই শুড আই টেল ইউ? এটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রাইভেট অ্যাফেয়ার।’
‘আমার কাছে বলার প্রয়োজন নেই মি. প্রাইম মিনিস্টার, আপনি বলবেন ইতিহাসের কাছে।’
মুজিব বললেন, ‘আমিই ইতিহাস। আমি ভুট্টোকে থামিয়ে বললাম, যদি আমাকে মুক্তি দেয়া না হয়, তাহলে আমি আলাপ করবো না। ভুট্টো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উত্তর দিলেন, আপনি মুক্ত, যদিও আপনাকে শিগগির ছেড়ে দিচ্ছি না। আমাকে আরো দুই বা তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তার পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করলেন। কিন্তু আমি অহঙ্কারের সঙ্গেই জানালাম, দেশবাসীর সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কোনো পরিকল্পনা করতে পারি না।’ এই পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘তাহলে তো কেউ বলতেই পারে যে, আপনাদের আলোচনা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়েছিল।’

‘তা তো বটেই। আমরা পরস্পরকে ভালোভাবে জানি। খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। কিন্তু তা হয়েছিল আমার জানার আগে যে, পাকিস্তানিরা আমার জনগণের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নিপীড়ন করেছে। আমি জানতাম না, তারা বর্বরোচিতভাবে আমার মা-বোনকে হত্যা করেছে।
আমি তাকে থামিয়ে বললাম, ‘আমি জানি মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি জানি।’ তিনি গর্জে উঠলেন, ‘তুমি কিছুই জানো না; আমি তখন জানতাম না যে, তারা আমার স্থপতি, আইনবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, আমার চাকরকে হত্যা করেছে এবং আমার বাড়ি, জমি, সম্পত্তি ধ্বংস করেছে, আমার...।’

তিনি যখন তার সম্পত্তির অংশে পৌছলেন, তার মধ্যে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যা থেকে তাকে এ প্রশ্নটা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম যে, তিনি সত্যিই সমাজতন্ত্রী কি না? তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যা...’। তার কণ্ঠে দ্বিধা। তাকে আবার বললাম, সমাজতন্ত্র বলতে তিনি কি বোঝেন? তিনি উত্তর দিলেন, ‘সমাজতন্ত্র’। তাতে আমার মনে হলো, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার যথার্থ ধারণা নেই।
এরপর ১৮ ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি রাগে ফেটে পড়লেন। নিচের অংশটুকু আমার টেপ থেকে নেয়া:
‘ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?’
‘ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাটি।’
‘ঢাকা স্টেডিয়ামে কোনো ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যে বলছো।’
‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যেবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও পনেরো হাজার লোকের সঙ্গে আমি হত্যাকা- প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।’
‘মিথ্যেবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়।’
“মি. প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে ‘মিথ্যেবাদী’ শব্দটি আর উচ্চারণ করবেন না। তারা মুক্তিবাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল।”
‘তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল যারা প্রতিরোধের বিরোধিতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছে।’
‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমাণ করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং কেউই প্রতিরোধের বিরোধিতা করেনি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। হাত-পা বাধা থাকায় তারা নড়াচড়াও করতে পারছিল না।’
‘মিথ্যেবাদী।’
“শেষবারের মতো বলছি, আমাকে ‘মিথ্যেবাদী’ বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।”
‘আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে?’
‘আমি নিশ্চিত হতাম যে, ওরা রাজাকার ও অপরাধী। ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং এভাবেই এই ঘৃণ্য হত্যাকা- এড়াতাম।’
‘ওরা ওভাবে করেনি। হয়তো আমার লোকদের কাছে বুলেট ছিল না।’
‘হ্যা তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল। এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলি ছোড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলি ছোড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য।
এরপর কি ঘটলো : যে দুই মোটা মন্ত্রী ঘুমুচ্ছিলেন গোটা সাক্ষাৎকারের সময়টায়, সহসা তারা জেগে উঠলেন। আমি বুঝতে পারলাম না মুজিব কি বলে চিৎকার করছেন। কারণ কথাগুলো ছিল বাংলায়।
সোমবার রাত : গোটা ঢাকা নগরী জেনে গেছে, মুজিব ও আমার মধ্যে কি ঘটেছে। শমশের ওয়াদুদ নামে একজন লোক ছাড়া আমার পক্ষে আর কেউ নেই। লোকটি মুজিবের বড় বোনের ছেলে। এই যুবক নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছে তার মামার কাছে। তার মতে মুজিব ক্ষমতালোভী এবং নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণাসম্পন্ন অহঙ্কারী ব্যক্তি। তার মামা খুব মেধাসম্পন্ন নয়। বাইশ বছর বয়সে মুজিব হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করেছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতির সচিব হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এছাড়া আর কিছু করেননি তিনি। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, মুজিব একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। ওয়াদুদের মতে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণ এটা নয়। আসলে একমাত্র ওয়াদুদের মাকেই মুজিব ভয় করেন। এই দুঃখজনক আচরণের জন্য তিনি পারিবারিকভাবে প্রতিবাদ জানাবেন। সে আরো জানালো, আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা সে তার মাকে জানাবে, যাতে তিনি এ ব্যাপারে মুজিবের সঙ্গে কথা বলেন। সে আমাকে আরো বললো, সরকারি দফতরে গিয়ে এ ব্যাপারে আমার প্রতিবাদ করা উচিত এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ প্রেসিডেন্ট খাটি ভদ্রলোক।
মুজিব সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যাবলী তার জন্য বিপর্যয়কর। ১৯৭১ এর মার্চে পাকিস্তানিদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকা-ের কিছুদিন আগে ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকায় এসেছিলেন। ইয়াহিয়া খান যথাশিগগির ফিরে যান। কিন্তু ভুট্টো ঢাকায় রয়ে যান। তাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাখা হয়। তার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ৯১১-৯১৩।
ইন্টারকন্টিনেন্টালের সর্বোচ্চ তলায় তখন ভুট্টোর ভূমিকা ছিল নিরোর মতো। নগরী যখন জ্বলছিল এবং এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ চলছিল, ভুট্টো তখন মদপান করছিলেন আর হাসছিলেন। পরদিন সকাল ৭টায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। আমি দেখেছি, যারা এক সময় পাকিস্তানিদের ভয়ে ভীত ছিল, তারা এখন মুজিবকেই ভয় করে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রচুর কথাবার্তা চলে এ দেশে। কিন্তু সবসময়ই তা বলা হয় ফিসফিসিয়ে, ভয়ের সঙ্গে। লোকজন বলাবলি করে যে, এই সংঘাতে মুজিব খুব সামান্যই হারিয়েছেন। তিনি ধনী ব্যক্তি। অত্যন্ত ধনবান। তার প্রত্যাবর্তনের পরদিন তিনি সাংবাদিকদের হেলিকপ্টার দিয়েছিলেন। কেউ কি জানে কেন? যাতে তারা নিজেরা গিয়ে মুজিবের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অবলোকন করে আসতে পারে। এখনো তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, জাতীয়তাবাদের কথা বলেন। তিনি কি তার জমিজমা, বাড়ি, বিলাসবহুল ভিলা, মার্সিডিজ গাড়ি জাতীয়করণ করবেন?
ভুট্টোর সঙ্গে মুজিবের প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তিনি ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তকে অরক্ষিত রাখার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেন। একজন নেতা হিসেবে তার মূল্য ছিল খুবই কম। তার একমাত্র মেধা ছিল মূর্খ লোকদের উত্তেজিত করে তোলার ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন কথামালার জাদুকর ও মিথ্যার জাদুকর; কিছুদিন আগে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি বলেছিলেন, করাচির রাস্তাগুলো সোনা দিয়ে মোড়া। তা দিয়ে হাটলে চোখ ধাধিয়ে যায়। অর্থনীতির কিছুই বুঝতেন না তিনি। কৃষি ছিল তার কাছে রহস্যের মতো। রাজনীতি ছিল প্রস্তুতিবিহীন। কেউ কি জানে ১৯৭০ এর নির্বাচনে তিনি কেন বিজয়ী হয়েছিলেন? কারণ সব মাওবাদী তাকে ভোট দিয়েছিল। সাইকোনে মাওবাদীদের অফিস বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং তাদের নেতা ভাসানী আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জনগণকে যদি আবার ভোট দিতে বলা হয়, তাহলে মুজিবের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্নতর হবে, যদি তিনি বন্দুকের সাহায্যে তার ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে না চান। সেজন্যই তিনি মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্রসমর্পণের নির্দেশ দিচ্ছেন না এবং আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, রক্তপিপাসু কসাই, যে ঢাকা স্টেডিয়ামে হত্যাযজ্ঞ করেছিল, সেই আবদুল কাদের সিদ্দিকী তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা। ইনডিয়ানরা তাকে গ্রেফতার করেছিল; কিন্তু মুজিব তাকে মুক্ত করেন।
এখন আমরা গণতন্ত্রের কথায় আসতে পারি। একজন মানুষ কি গণতন্ত্রী হতে পারে, যদি সে বিরোধিতা সহ্য করতে না পারে? কেউ যদি তার সঙ্গে একমত না হয়, তিনি তাকে ‘রাজাকার’ বলেন। বিরোধিতার ফল হতে পারে ভিন্নমত পোষণকারীকে কারাগারে প্রেরণ। তার চরিত্র একজন একনায়কের, অসহায় বাঙালিরা উত্তপ্ত পাত্র থেকে গনগনে অগ্নিকু-ে পতিত হয়েছে। বাঙালি রমণীদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের সম্পর্কে কথা না বলাই উত্তম। তিনি নারীদের পাত্তাই দেন না...।
বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আমাকে আবার মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। সব ব্যবস্থা পাকা।
প্রেসিডেন্ট যে প্রচেষ্টা করেছিলেন তা খুব একটা সফল হয়নি। তিনি দুজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার নির্দেশ পালন করা হয়। মুজিবের কাছে একটা হুঙ্কার ছাড়া তারা আর কিছু পায়নি। তবে এবার একটা করিডোরের বদলে একটা কক্ষে অপেক্ষা করার অনুমতি পেলাম। আমি বিকাল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একজন বয় আমার চায়ের কাপ পূর্ণ করে দিচ্ছিল এবং এভাবে আমি আঠারো কাপ চা নিঃশেষ করলাম। উনিশ কাপের সময় আমি চা ফোরে ছুড়ে ফেলে হেটে বেরিয়ে এলাম। আমাকে অনুসরণ করে হোটেলে এলো মুজিবের সেক্রেটারি ও ভাইস সেক্রেটারি। তারা বললো, মুজিব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
পরদিন সকালে ঠিক সাতটায় আমি হাজির হলাম এবং সকাল সাড়ে নয়টায় মার্সিডিজযোগে মুজিবের আগমন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। একটা কথাও না বলে তিনি অফিসে প্রবেশ করলেন। আমিও অফিসে ঢুকলাম। আমার দিকে ফিরে তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘গেট আউট’। আমি কক্ষ ত্যাগ করতে উদ্যত। তিনি বললেন, ‘গেট ইন হিয়ার।’ আমি ফিরলাম এবং তখনই তিনজন লোক পোস্টার আকৃতির একটি ছবি নিয়ে এলো। দেখে তিনি বললেন, ‘চমৎকার’। এরপর তিনি বললেন, এই মহিলা সাংবাদিককে দেখাও। আমি ‘চমৎকার’ শব্দটি উচ্চারণ করলাম। এ ছিল এক মারাত্মক ভুল। তিনি বজ্রের মতো ফেটে পড়লেন। তিনি ক্ষিপ্ত। ছবিটি ফোরে ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা চমৎকার নয়’। আমি কিছু না বুঝে নিশ্চুপ থাকলাম।
আমি তার উত্তেজনা হ্রাস করতে সক্ষম হলাম। যেহেতু আমি ভুট্টোর সঙ্গে তার সত্যিকার সম্পর্কটা খুজে পেতে চাই, সে জন্য ভুট্টো সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। নামটা বলার মুহূর্তেই তিনি জ্বলে উঠলেন এবং বললেন, তিনি শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে চান। আমি প্রশ্ন করলাম, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সম্ভাবনা আছে কি না?’ খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে তিনি বললেন, ‘এ সময়ে, আমার আর কোনো আগ্রহ নেই।’ এই বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধীকেও বিস্মিত হতে হবে যে, মুজিব কলকাতা করায়ত্ত করতে চায়। আমি বললাম, তার মানে আপনি বলতে চান, অতীতে আপনার আগ্রহ ছিল এবং ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে।’ ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করলেন, আমি তাকে একটা ফাদে ফেলতে চাচ্ছি। নিজের ভুল সংশোধন করার বদলে তিনি টেবিলে মুষ্টাঘাত করে বলতে শুরু করলেন, আমি সাংবাদিক নই বরং সরকারি মন্ত্রী। আমি তাকে প্রশ্ন করছি না, দোষারোপ করছি। আমাকে এখনই বের হয়ে যেতে হবে এবং আবার আমি যেন এ দেশে পা না দিই।
এই পর্যায়ে আমি নিজের ওপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম এবং আমার মাঝে উত্তেজনার যে স্তূপ গড়ে উঠেছিল তা বিস্ফোরিত হলো। আমি বললাম, তার সবকিছু মেকি, ভুয়া। তার পরিণতি হবে খুবই শোচনীয়। যখন তিনি মুখ ব্যাদান করে দাড়ালেন, আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম এবং রাস্তায় প্রথম রিকশাটায় চাপলাম। হোটেলে গিয়ে বিল পরিশোধ করলাম। স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে যখন বেরুতে যাচ্ছি, তখন দেখলাম মুক্তিবাহিনী নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা এ কথা বলতে বলতে আমার কাছে এলো যে, আমি দেশের পিতাকে অপমান করেছি এবং সেজন্য আমাকে চরম মূল্য দিতে হবে। তাদের এ গোলযোগের মধ্যে পাচজন অস্ট্রেলিয়ানের সাহায্যে পালাতে সক্ষম হলাম। তারা এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে প্রবেশ করছিল। এয়ারপোর্টে দুজন ইনডিয়ান কর্মকর্তা আমাকে বিমানে উঠিয়ে নিলেন এবং আমি নিরাপদ হলাম।
(২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)
ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী থেকে
অনুবাদ : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

কৃতজ্ঞতা ঃ http://goodbyesomewhereinblog.blogspot.com/2009/03/blog-post_7770.html

আমার জীবনের চন্দ্রবিন্দুহীন বছরগুলো : দি যায়যায়দিন ইয়ারস (পার্ট ফোর)

এই জীবনে একটা শিক্ষা ছোটবেলায় পাইছিলাম, সেটা হইলো বিপদে না পড়লে কেউ শিখতে চায় না। ঠকতে ঠকতে বা ঠেকতে ঠেকতে মানুষ শিখে বেশি। পানি খাইতে খাইতে সাঁতার শিখে, উষ্ঠা খাইতে খাইতে হাঁটা শিখে। শিক্ষা অর্জন যদি সারভাইভালের সঙ্গে যুক্ত না হইতো তাইলে মানুষ কি এইভাবে শিখতো? অবশ্য জ্ঞানীদের কথা আলাদা। শিক্ষা হইলো নেশা এনাদের কাছে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা হইলো তফাতে থাকার জিনিশ। এখন কেউ যদি আমার নিকটে আইসা বলে, মাহবুব তুমি আমার কাছে আসো, তুমি এইটা তো জানো না তোমারে শিখাই। তাইলে আমি কী ভাববো? প্রথমত ভাববো এই শিখাটা আমার কোন কামে লাগবো। দ্বিতীয়ত, সে যে শিখাইতেছে সেইটার পিছনে তার উদ্দেশ্য কী। এই দুইটার কোনোটার সুদত্তর না পাইলে ফাও কামে কেউ কিছু শিখতে চায় না। এখন ভাবে ঘোষণা দিয়া যদি কোনো দৈনিক পত্রিকা বাইর হয় যে তারা বাঙালি জাতিকে শিখাইবে, তাইলে সেই শিক্ষা কয়জনে নিবে? মানুষ দৈনিক পইড়া খবর জানতে চায়, টাকা দিয়া তারা বিশ্লেষণ কেনে তথ্য কেনে। এইগুলা থিকা শেখে বটে কিন্তু সম্পাদকরে মাস্টার মশাই মনে কইরা শেখে না। কিন্তু শফিক ভাই এমন একটা পত্র্রিকা বাইর করলেন যেইটার উদ্দেশ্য হইলো একটা স্কুল বা কলেজ হওয়া। আর উনি সেইটার হেডমাস্টার। সঠিক উচ্চারণে ইংরেজি লেখা উচিত। যে যে বানানে আছে সেইভাবে লেখা উচিত। তাই না? শফিক ভাইয়ের বিশাল অবদান হইলো তিনি বাঙালি জাতিকে সঠিক বানানে ইংরেজি লেখা শিখাতেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হইলো, সঠিক বানানে ও উচ্চারণে বাংলা শিখাটা কি উচিত না? উনি কিন্তু এইখানে উল্টা অবস্থান নিলেন। বানান নিয়া বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন সঞ্জীবদা একদিন কইলেন, আমার মেয়েকে আমি তো যায়যায়দিন পড়তে দেব না। সে ইস্কুলে গিয়ে পাঁচ বানান পাচ লিখুক এটা আমি চাই না।
শফিক ভাই বাংলা বানান আর উচ্চারণ শিখাইতে চাইছিলেন বিকৃত কইরা আর ইংরেজি বানান ও উচ্চারণ শিখাইতে চাইছিলেন সঠিক কইরা। এক জায়গায় রক্ষণশীল আরেক জায়গায় বিপ্লবী। জিনিশটা সবাই বিশ্লেষণ কইরা দেখে মানে নাই তা না। কিন্তু শফিক ভাইয়ের ঘোর ভক্ত লোকেও কিন্তু কিন্তু করছে। শফিক ভাই বলতেন, ভাষাকে সহজ করার জন্য তিনি এইটা করতেছেন। কেউ তার কথা বিশ্বাস করে নাই। তার সম্পাদিত পত্রিকার নিউজগুলা প্রথম থেকে বাংলা একাডেমীর বানান রীতিতেই ছাপা হইতো। নিউজ সেকশন তার কথা মানে নাই। শুধু ফিচারের ম্যাগাজিনগুলোতে তার বানান রীতি ব্যবহৃত হইতো। পরে অমিতদাদের স্যাক করার পর নিউজে শফিক ভাইয়ের বানান রীতি ফিরে আসছিল। বানান নিয়ে কিছু বলতে গেলেই শফিক ভাই টিটকারি দিতেন। তিনি যে একটা বিপ্লবী কাজ করছেন এইটা বলতেন। শেষে যায়যায়দিনের কলিকালে শফিক ভাইয়ের উপলদ্ধি হইলো এই বানান মানুষ নিতেছে না। নিবে না। তখন তিনি বাংলা একাডেমীর বানানে ফিরলেন বটে। কিন্তু চন্দ্রবিন্দু ফিরাইলেন না। এই দুঃখে আমি হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে ব্লগ লিখতে বসছি।
বানান সংস্কার, ইংরেজি শিক্ষার আসর, সাহিত্য শিক্ষার আসর এইসব নিয়া ওপেন কলেজ হওয়ার কথা আছিল। বাঙালি সেই ওপেন কলেজ দেখতে পাইলো না। কারণ, আগে তো পত্রিকা হইতে হবে। সেই পত্রিকাকে সফল হইতে হইবে। তারপর সেই সফল পত্রিকার সম্পাদকের কথা লোকে শিক্ষণীয় মনে কইরা শুনবে। এইগুলা বাদ দেই। সোজা কথা কই। হেড মাস্টারের অ্যাপ্রোচ শিক্ষিত লোকে নিতে পারে নাই। পত্রিকা তো শিক্ষিত লোকেই পড়ে।
যায়যায়দিনে জয়েন করার আগ দিয়া আমি জানতাম না, ওইখানকার সাহিত্য পাতার বিদেশী দশা হইবে। রাইসু ভাই আছেন। সঞ্জীবদা, অমিতদা আছেন। বিদেশী সাহিত্য পাতা কেমনে হয়? আমি ভাবছিলাম, বড় জোর মৌচাকে ঢিল হবে। শফিক ভাই এই সাহিত্য পত্রিকাটা সুন্দর করে বের করতেন। আইডিয়াটা চমৎকার ছিল। কিন্তু জয়েন কইরাই শুনলাম বিদেশী সাহিত্য নির্ভর একটা কিছু হবে। রাইসু ভাই কিছু বুঝানোর চেষ্টা করে ততোদিনে ক্ষান্ত দিছেন। শফিক ভাইয়ের সঙ্গে সাহিত্য বিষয়ক প্রথম আলাপের কথা তো কইছিই। শফিক ভাইয়ের পরামর্শ অনুসারে আমরা ম্যাগাজিনের প্রথম দ্বিতীয় সংখ্যা করলাম। শফিক ভাই দেখি তেমন খুশি না। চিন্তামূলক, তাত্ত্বিক লেখা বাদ দিতে কয়। দেয়া হইলো। তারপরও উনি কয় কঠিন হইতেছে। এই লেখা পইড়া আমার ড্রাইভার তো বুঝবে না। আমরা আরও সহজ করলাম। কিন্তু তারপরও উনি আমাদের দিকে চির নাখোশের ভঙ্গিতে তাকায়া থাকেন। ফাঁকে তারে জিজ্ঞাসা করা হইলো, আমরা কিছু কিছু দেশী সাহিত্য ছাপবো কি না। উনি সোজা না কইরা দিলেন। বললেন, আমি না বলা পর্যন্ত বিদেশী জিনিশই ছাপো। এদেশে কেউ লিখতে জানে না। কীভাবে লিখবে সেটা আমার কাছে শিখতে হবে। বুঝেছো?
সো, আমরা ওইভাবেই ছাপি। দেশী সাহিত্য বলতে, পাঠকের পাঠানো গল্প। আর রিপৃণ্ট নামে একটা বিভাগ। আর আমি লিখতাম সাময়িকী রিভিউ। বাকী সব শফিক ভাইয়ের মতো। তারপরও উনি কন। না এইভাবে না। পরে একদিন আমরা ভাবলাম, কীভাবে করবো এইটা ওনারে জিগাই। গিয়া জিগাইলাম, শফিক ভাই কী কী ম্যাটার দেব সেইটা আপনিই বলেন। উনি কন, গার্ডিয়ান দেখো, নিউ ইয়র্ক টাইমস দেখো। বলাবাহুল্য আমরা সেইগুলাই দেখতেছিলাম, ছাপতেছিলাম। ফলে, সিদ্ধান্তে আসা গেল, উনি তৃপ্ত হবেন না। আমাদের কাজ এইভাবেই চালাইতে হবে।
বাংলা ভাষায় ওনার কাছে দুইজন লেখকের নাম খুব শুনতাম। বনফুল আর সৈয়দ মুজতবা আলী। এনাদের লেখা রিপৃন্ট করতে বলতেন। করা হইলো। রাইসু ভাই চলে যাওয়ার পর আবার আমারে বললেন বনফুলের লেখা রিপৃন্ট করতে। আমি বেশি বেশি করে বনফুল রিপৃন্ট করে ওনাকে তৃপ্ত করতে পারলাম। বনফুল, আমার প্রিয় লেখক, ক্ষমা করবেন। এইভাবে অনেক রিপৃন্ট করে আপনার হাত থেকে আমার মুক্তি মিললো।
রাইসু ভাই যাওয়ার পর আমি একা। ম্যাগাজিন চালাই। ৩২ পৃষ্টা থেকে ১৬তে নেমে আসলো। শফিক ভাইয়ের মনও পরিবর্তন হইলো কিছু। ১৬ থেকে ব্রড শিটে দুই পৃষ্ঠায় আইলো। শফিক ভাইয়ের মন আরও নরম হইলো। আমি ততোদিনে বিদেশী সাহিত্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নেট থেকে ম্যাটার নামাই অনুবাদ করি, ছাপি। ঝুট ঝামেলা নাই। হঠাৎ একিদিন শফিক ভাই কইলেন, এবার কিছু দেশী লেখা ছাপো। আমি অনেক আগে শোনা শফিক ভাইয়ের কথাটা ফেরত দিলাম তাকে, বললাম শফিক ভাই এদেশের কারো লেখা হয়? উনি আমার উত্তরে একটু চমকে গিয়েছিলেন মনে পড়ে। আমি তীরে এসে আর তরী ডুবাই নাই। ওইভাবেই বাকীটা সময় পার করেছিলাম। কিন্তু দেশী সাহিত্য বিষয়ে উনি কী করতে চান এই পরখ করার বাসনা হইলো আমার মনে। আমি বিভিন্ন লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য একটা লিস্ট করে তার কাছে নিয়া গেলাম। তিনি দেখলেন। কিছু বললেন না। পরে একদিন এসে বললেন, আপাতত আইডিয়াটা ড্রপ করো।
তবে হ্যাঁ। আমি এবং আমরা কিছু দেশী সাহিত্য ছেপেছিলাম। বলাবাহুল্য বিশেষ ক্লেশ শিকার করে।
বানান ও সাহিত্য ছাইড়া এখন আসি ম্যাগাজিন প্রসঙ্গে।
যায়যায়দিন দৈনিক মাত করে দিল ম্যাগাজিন দিয়া। সাত দিন সাতটা ম্যগাজিন। গ্রেট।
এই দেশে কোনো সম্পাদককে আপনি যদি বলেন, একটা হাই বাজেটের পত্রিকা করেন। উনি বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সাংবাদিক আনবেন। বিভিন্ন বিভাগ, রঙিন পাতা-পুতা করে ভরায়া দিবেন। সঙ্গে হয়তো তিনচারটা ম্যগাজিনেরও ব্যবস্থা করবেন। সঙ্গে ২৪ পৃষ্টার দৈনিক। শফিক ভাই, এই জায়গায় খেল দেখালেন। সাতটি ম্যাগাজিন করে।
এরপর কিছু দিন গেলে আপনি এখন সম্পাদককে বলেন, ভাই লাভ দেখান। মানে অন্তত ব্রেক ইভেনে আইনা দেন। সম্পাদক চোখ বন্ধ করে একের পর এক ম্যাগাজিন পাতা বন্ধ কইরা দেবেন। পাতার দায়িত্বে থাকা লোকদের বরখাস্ত করবেন। সহজ হিসাব। শফিক ভাই এইখানে মাত কইরা দিলেন। তিনি একেবারে ১০৪ জনরে বরখাস্ত কইরা তারপর ম্যাগাজিন বন্ধ করলেন। পাতা কমাইলেন।
আমার প্রশ্ন হইলো, ভাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট তো আপনে আমি না। ২৩ বছর ধইরা সম্পাদনা তো আপনে করতেছেন আমি না। তো যে জিনিশ কইরা লাভ হইবো না সেইটা আপনি করতে যান কোন হিসাবে। আর সেই রেলাভের জন্য সাংবাদিকদের ভিক্টিমাইজই বা করেন কোন হিসাবে?

কৃতজ্ঞতাঃ http://goodbyesomewhereinblog.blogspot.com/

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৩

আমার জীবনের চন্দ্রবিন্দুবিহীন বছরগুলো : দি যায়যায়দিন ইয়ারস

লাভ রোড নামটা তখনো পাকাপোক্ত হয় নাই। লাভরোড হয়ে সমকালে কাজ করেতে যাইতাম। যাইতে যাইতে যায়যায়দিনের সুরম্য অট্টালিকার দিকে তাকায়া থাকতাম। বেশি তাকাইতাম না। কারণ পরিচিত অনেক লোক ওইখানে কাজ করতো। মনে হইতো, বেশি দেখলে ওরা মনে করবে চাকরি চাইতেছে। চাকরি অবশ্য চাইতেছিলাম আজকের কাগজে কাজ করার সময় থেকে। একদিন কামুদা সহ ইস্কাপনের টেক্কায় গেলাম। সেইখানে সঞ্জীবদার লগে পরিচয় হইলো। অমিতদার সঙ্গেও পরিচয় হইলো। আজকের কাগজে কাজ করি বইলা ওনারা তেমন একটা পাত্তা দিল না। তবু বইসা বইসা দেখলাম ওনারা কম্পিউটারে টেবিল টেনিস খেলা নিয়া খুব ব্যস্ত। ফাঁকে সঞ্জীবদার একটা ফোন আইলো। উনি আধা ঘণ্টা ধইরা কারে জানি ইংরেজি শিক্ষার ফজিলত বুঝাইতেছিলেন। কী ধৈর্য! প্রথম আলো থেকে দলে দলে লোকজন গিয়া জয়েন করতেছে। কিন্তু বাইরের কেউ চাকরি চাইলেই ওনারা বলেন, পরীক্ষা দেওয়া লাগবে। ভাষা লেখা শিখতে হবে। শফিক রেহমানের ভাষার মতো ভাষা হইতে হবে। সঞ্জীবদা কয়, টিনেজারদের জন্য একটা ম্যাগাজিন করবো। তুমি একটা প্লান নিয়া আইসো। একদিন হেভি খাইটা প্লান নিয়া গেলাম। উনি কইলেন, এইবার একটা অনুবাদ কইরা নিয়া আসো। আমি কম আগ্রহ দেখাইলাম। বল্লাম, পরীক্ষা দিতে পারবো না। তো একটু মনভার মনভার কইরা ফিরতে ফিরতে ওইদিন কামুদারে জিগাইলাম, কামুদা কী করা যায়? এই পত্রিকা কি বাইর হবে? লোকে তো কয় জমি দখল করার জন্য পত্রিকা বাইর করতেছে। কামুদা কয়, সাইটে গেছিলা কোনোদিন? লাভরোডে তখন অট্টালিকা তৈরি হইতেছে। অট্টালিকার জায়গাটারে ওনারা সাইট বলে। কামুদা কয়, ভাবেসাবে তো মনে হয় মেলা দেরি আছে। আমি জিগাই, তাইলে কি মনে করেন আমার এখন সমকালে যোগাযোগ করা উচিত? কামুদার পরামর্শ নিয়া আমি আমার গুরুস্থানীয় বন্ধু সাইমন জাকারিয়ার লগে যোগাযোগ করলাম। উনি আমারে ইউটিসি বিল্ডিংয়ে নিয়া গিয়া মিজান ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করাইলেন। মিজান ভাই সমকালের জন্য বিশাল এডিটোরিয়াল টীম গড়তেছেন। আমারে নিয়া নিলেন। কিছুদিন যাইতেই আমার প্রতিভা প্রকাশ হইলো। গুরুত্ব বাড়লো। ভালই চলতেছিল। কিন্তু ইউটিসির মালিক নানা ফন্দিফিকির কইরা সমকালরে বিল্ডিং থিকা বাইর কইরা দিল। কাওরান বাজার থেকে আমরা তেজগা চইলা গেলাম। ফিচার আর এডিটোরিয়াল বারোতলা গার্মেন্টসে আর নিউজ কুনিপাড়ায়। ওই প্রথম তেজগাঁ গেলাম। সে এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা। পরে আমরাও কুনি পাড়ার অফিসে চইলা আসলাম। অফিস যাইতাম ফার্মগেট থেকে রিকশায়। লাভ রোড হয়ে। সমকালে আমার চাকরির বছর খানেক পর যায়যায়দিনে লোকেরা ইস্কাটনের ঠেক থেকে লাভ রোডে আইলেন। এইটাতে আমার নতুন মুসিবত তৈরি হইলো। আমি ওইদিক দিয়া গেলেই খালি বছরখানেক আগের চাকরি চাওয়ার স্মৃতি মনে হয়। মাঝে মাঝে কামুদারে দেখি। রাইসু ভাইরে দেখি। ওনারা মাসুদের দোকানে চা খাইতে ডাকেন। আমি লাজুক লাজুক ভাবে চা খাই। রাইসু ভাই কয়, লজ্জা পান কেন। যারা চাকরি করতেছে, তারাও তো একদিন চাকরির জন্য আসছিল। এর মানে এই না যে আমি চাকরি চাইতেছিলাম বইলা রাইসু ভাই এই কথা বলে। কথার মর্তবা হইলো, ওনার একজন সহকারি দরকার, তাই জন্য উনি আমারে আরেঠারে পরখ করেন। এইভাবে কথা স্পষ্ট হইতে থাকে। আমি বলি, আমি এডিটোরিয়ালেই যাইতে চাই। তো রাইসু ভাই একটা ফাঁকা দিন দেখে শফিক রেহমানের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করেন। শফিক রেহমানকে দেখে আলগা হাসি ঝুলায়া বইসা থাকলাম। সমকালে ছাপা হওয়া অনুবাদ, এডিটোরিয়াল, কলাম দেইখা উনি কিছু প্রসন্ন হইলেন। জিগাইলেন, মুভি দেখো? হ্যাঁ দেখি। শেষ কী মুভি দেখেছো। আকিরা কুরোশাওয়ার একটা সিনেমা দেখছিলাম। কইলাম। উনি বোদ্ধার মতো একটা হাসি দিয়া কইলেন, আমি আগেই বুঝেছিলাম। আজিজ মার্কেটের লোকেরা তোমরা এইসবই দেখবা। আমি কইলাম, কেন হলিউডের মুভিও তো দেখি। বলে সে সময় দেখা একটা সিনেমার নাম কইলাম।
যাই হউক, বিষয়টা চাপা পড়ে গেল। আমি কিছু লেখা আর সিভি দিয়া আইলাম কিন্তু কোনো রেসপন্স নাই। হঠাৎ একদিন রাইসু ভাই যাইতে কইলেন। যায়যায়দিন তখন বের হয় বের হয় করতেছে। শেষ মুহূর্তে, রাইসু ভাইরে লোক দিবে। উনি এসিস্ট্যান্ট এডিটর, আমারে সিনিয়র সাব-এডিটর হিসাবে নেওয়ার কথা। সাহিত্য ম্যাগাজিনে। গিয়া একটা বিশাল ফিরিস্তির ফর্ম পূরণ কইরা আইলাম। দুই একদিনের মধ্যেই ব্যাপার ফায়সাল হইলো। ২০০৬ সালের পয়লা এপ্রিল জয়েন করলাম।
হেভি অফিস। ফিটফাট। স্মার্ট স্মার্ট লোক ঘোরাফিরা করে। হেভিওয়েট লোকদের ভিড়ে কথা বলারই জো নাই। আমি গিয়া রাইসু ভাইয়ের সিটে বইসা থাকি। উনি আইলে কথা হয়, আর কথা হয় কামুদা আইলে। বাকী সময় চুপচাপ থাকি। আমার লগে কেউ কথা কয় না।
রাইসু ভাইয়ের সিটে বইসা বইসা লক্ষ্য করতে থাকি আশপাশের ব্যাপার। সিটটা বিল্ডিংয়ের মাঝামাঝি জায়গায়। হঠাৎ একদিন দেভি বিল্ডিং কাঁপতেছে। ভয়ে তাকায়া দেখি কোনো ব্যাপার নাই। পরে বুঝলাম লোকে হাঁটলেও বিল্ডিং কাঁপে। তবে সবাই হাঁটলে বিল্ডিং কাঁপতো না। দুইজন বিল্ডিং কাঁপায়া হাঁটতে পারতো। একজন ছোটন ভাই। আর শফিক ভাই।
একদিন শফিক ভাই রাইসু ভাইয়ের সিটের পাশ দিয়া যাইতেছিলেন। আমারে একা দেইখা বললেন, 'তুমি জয়েন করেছো।' আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি আমাকে নিয়ে ছোটন ভাইয়ের ঘরে নিয়া গেলেন। বললেন, আমরা গতানুগতিক সাহিত্য করবো না। বিভিন্ন পত্রিকার নাম করে বললেন, এসব চলবে না। মনে রেখো, আমরা ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড কিছু করার চেষ্টা করছি। তুমি সব সময় বাইরের পত্রিকা ফলো করবে। আর শোনো, আমাদের পত্রিকায় আর এন ঠাকুর আর কে এন ইসলাম চলবে না। মার্কেজ চলবে না। তোমরা এগুলো পঁচিয়ে ফেলেছো। নতুন কিছু আনো। নতুন মুখ আনো। না পেলে শুধু বিদেশী সাহিত্য ছাপো। পাঠককে শিক্ষিত করে তোলো। বাংলাদেশে কেউ কিছু লিখতে পারে না, বুঝলে। আমার সঙ্গে কাজ করলে বুঝতে পারবে লেখা কী ব্যাপার।
আমার মগজ বনবন করে উঠলো। বিদেশী সাহিত্য দিয়া ম্যাগাজিন? কিন্তু কাজ বলে কথা। ধীরে ধীরে বিদেশী পত্রিকা ঘাটাঘাটি শুরু কইরা দিলাম। ম্যাটার কিছু অনুবাদ করা শুরু করলাম। রাইসু ভাই আর আমি সারাক্ষণ নানা প্লান করতাম। বিভিন্ন সংখ্যার লেখার কথা ভাবতাম। কাজ কিছু আগাইলো। শফিক ভাইয়ের মতো করেই। আমার চিন্তায় বিদেশী সাহিত্য কিছু কিছু করে ঢুকতে থাকে।
প্রথম একটা লেখা অনুবাদ করতে গিয়া আমি বুঝতে পারি আমার জীবনে বিশাল সর্বনাশ হয়ে গেছে। ছাত্রজীবনে গালিব একটা পত্রিকা করেছিল, যেইখানে মাতব্বরি কইরা নতুন বানানরীতি চালু করছিল সে। ণ ও ষকে নির্বাসন দিয়েছিল সেখানে। প্রতিবাদ হিসাবে আমি গালিবের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ১৮টি ভাষণ দিছলাম। গালিবের সঙ্গে নয় দফা ঝগড়া করছিলাম। আর ওই পত্রিকায় কখনো লেখি নাই।
এখন দেখি এমন এক চাকরি নিছি যেইখানে বাংলা বানানের সর্বনাশ হয়ে গেছে। ঋ-কারের আধিক্য। ইংরেজি শব্দে অনর্থক ব্যবহার চলছে। বাংলা কোনো ভাল প্রতিশব্দ লিখে পাঠালেও প্রুফে দেখা যাইতো শব্দ ইংরেজি কইরা দিছে। সবচেয়ে বড় কথা চন্দ্রবিন্দুই নাই। চন্দ্রবিন্দু আমার প্রিয় বর্ণ। শব্দের মাথায় চাঁদের মতো। সবই ধীরে ধীরে মাইনা নিতে পারলে এখন পর্যন্ত চন্দ্রবিন্দুর ব্যাপারটা আমি মানতে পারি নাই। ফলে, আমার যায়যায়দিনে কাজ করার দুইবছরকে আমি চন্দ্রবিন্দুর উদ্দেশে উৎসর্গ করছি। আমি চান্স পেলেই বিভিন্ন শব্দে প্রয়োজনীয় চন্দ্রবিন্দু দিতাম। আমার দুই বছরের কর্মজীবনে আমি কেএন ইসলাম বা আর এন ঠাকুরের নাম নেই নাই। মার্কেজকে নিয়া কোনো আয়োজন করি নাই। কিন্তু দুইতিনবার জবরদস্তি করে হেডলাইনে পর্যন্ত চন্দ্রবিন্দু দিছিলাম। ছাপা হওয়ার পর চন্দ্রবিন্দুর দিকে তাকায়া হাসছিলাম।
শফিক ভাইয়ের কথা মতো আমরা বিদেশী সাহিত্য ছাপতে থাকি। কিন্তু কোনোদিনই ওনারে খুশী করতে পারি না। কী ব্যাপার! দেশে বিদেশী সাহিত্যের জোয়ার তৈরি হইলো, কিন্তু উনি অতৃপ্ত। কারণ কী? গবেষণা কইরা আমরা বাইর করলাম, সহকর্মীদের অনেকেই রাইসু ভাইয়ের শত্রু, বাই ডিফল্ট আমারও শত্রু। হেরা শফিক ভাইয়ের কান ভারী করে। আর সেইটা শুইনা তিনি আমাদের ওপর অখুশী থাকেন। আমি হিসাব কইরা দেখলাম চারটা ক শফিক ভাইয়ের পতনের জন্য দায়ী :
১. কমপ্লেক্স (সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ও যায়যায়দিন মিডিয়া কমপ্লেক্স)
২. কিচেন কেবিনেট
৩. কানকথা
৪. ক্যামোফ্লেজ
কানকথায় তিনি খুব বিশ্বাস করতেন। এতটাই যে, আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যেতাম একই ব্যক্তি কীভাবে আশি-নব্বই দশকে কীভাবে এত সফল একটা সাপ্তাহিক করতে পেরেছিলেন। শফিক ভাই সাপ্তাহিক ছাইড়া দৈনিক করলেও সাপ্তাহিক থেকে নিজের মনকে দৈনিকে আনতে পারেন নাই। তিনি দৈনিক পরিচালনা করতেন সাপ্তাহিকের লোকদের কুপরামর্শে। এনারা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকে দৈনিকের লোকদের দেখতে পারতো না। ফলে, একটা কিচেন কেবিনেটের আকার ধারণ করে প্রতিদিন শফিক ভাইয়ের কানভারী করতো। এই করে করে শেষ পর্যন্ত শফিক ভাই দৈনিকের ১০৪জনকে বরখাস্ত করে সাপ্তাহিকের সেই কিচেন কেবিনেটকেই শাক্তিশালী করে তোলেন। এই যে তিনি কানকথায় বিশ্বাস করতেন, কিচেন কেবিনেট রাখতেন তার মূল কারণ তিনি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন। মানসিকভাবে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। আমি দেখছি, তিনি যে লাফিয়ে সিঁড়ি ভাঙেন। প্রচুর হাঁটেন, অফিসে ছোটাছুটি করেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, প্রচুর লেখেন সেইটা আসলে তার ক্যামোফ্লেজ। তিনি মূলত বৃদ্ধই ছিলেন। কিন্তু বহু মানুষ তার ক্যামোফ্লেজ দেখে তাকে কর্মক্ষম মনে করতো। আমি তার এই কর্মক্ষমতার প্রশংসা করতোম। তিনি দরকার পড়লে কখনো ডেকে পাঠাতেন না। নিজেই আসতেন। এটা আমার খুব ভাল লাগতো। বানান বিপর্যয় ছাড়া তার বাদবাকী ভাষা সংস্কার আমি সমর্থন করতাম। বিদেশী সাহিত্য ছাপানো বিষয়ে আমি সহমত পোষণ করেছি, কিন্তু দেশীয় জিনিশ বাদ দেয়া সমর্থন করি নাই। তার ভাষা সহজ ও সুপাঠ্য। অল্পশিক্ষিত মানুষও তার কথা বোঝে। তিনি খুব সহজে মানুষকে কনভিন্স করতে পারতেন। জনপ্রিয় ব্যাপারগুলার প্রতি তার খুব আগ্রহ, সবসময় চাইতেন এভারেজ চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করতে। তার নিজের চিন্তা এক্সট্রা অর্ডিনারি হলেও, নিজে প্রচুর ভাল বই পড়লেও, ভাল সিনেমা দেখলেও পাবলিক যেইটা পছন্দ করে তিনি সেইটার কথা লিখতেন ও বলতেন।
আজ ইতি।। ইচ্ছা হইলে আবার লিখবোনে।।

আমার জীবনের চন্দ্রবিন্দুহীন বছরগুলো : দি যায়যায়দিন ইয়ারস (পার্ট টু)

শফিক ভাই মাঝে মাঝে খুব ক্ষেপে যেতেন। কোনো বানান ভুল হলে, কোনো নিউজ নিয়ে সমস্যা হলে রেগে অফিসজুড়ে হনহন করে হেঁটে বেড়াতেন। তোমরা কিচ্ছু জানো না। তোমরা কিচ্ছু জানো না বলে হেঁকে উঠতেন। কারো টেবিল নোংরা দেখলে আগে উনি ছোট একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দিতেন। আমার পাশের টেবিলের এরকম বেহাল দশা হয়েছিল। রাতে তিনি লিখে গিয়েছিলেন, তোমার স্থান ডাস্টবিনে হওয়া উচিত। কে যেন নোটিশটা তুলে আমার টেবিলে লাগিয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকালে শফিক ভাই এসে বললেন, দেখেছো? আমি বললাম, আমার টেবিল তো গোছানো। উনি বললেন, তাতে কি পাশের টেবিল নোংরা থাকলে তোমার উচিত সেটা গুছিয়ে রাখা। শোনো তোমাদের ভাগ্য যে, তোমরা আমার সাথে এরকম একটা অফিসে কাজ করতে পারছো। টাইমের সম্পাদক এসে বলে গেছে, এরকম অফিস সে দেখেনি। তোমাদের উচিত আমার কাছ থেকে শেখা। মাঝে মাঝেই অফিস নিয়ে তিনি গর্ব করতেন। পার্ক, ডরমেটরি, সিনেমা হল, ক্যাফে নিয়ে তার গর্বের অন্ত ছিল না। নিয়ম করে আমাদের সেটা শুনতে হতো। যখন তিন মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে তখনও শুনতে হতো। যখন উৎসবভাতা বন্ধ হয়ে গেছে তখনো শুনতে হতো। এ কথা ঠিক যে, সব সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে অফিসটা খুব সুন্দর বানিয়েছেন তিনি। নিজের টাকায় বানান নাই, তাতে কী? অন্যের টাকা দিয়ে এরকম অফিসও বা কয়জনে বানিয়েছে? ভাবতে অবাক লাগে এত বড় অফিস বানিয়েছিলেন তিনি কিন্তু অফিসে উৎপন্ন হওয়া মশা মারার স্প্রে কেনার ব্যবস্থা করতে পারতেন না। কারণ ইনভেস্টররা মশা মারার টাকা দিতে চাইতেন না। মশার অত্যাচারে যখন একেবারে কাহিল দশা তখন আমাদের এক কলিগ প্রতিবাদ হিসেবে কয়েল জ্বালিয়েছিলেন। সেই কয়েল নেবাতে এসে কিচেন কেবিনেটের পুরনো এক সদস্য সেই কলিগের সঙ্গে বাজে আচরণ করলে আমি চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছিলাম। পরে শফিক ভাই এসে সেই চেঁচামেচি থামিয়েছিলেন। এ ঘটনার কয়েক মাস পর সেই কলিগকে স্যাক করা হয়। অনেকেই বলেছিলেন, কয়েল জ্বালানোর জন্য তার চাকরি চলে গেছে। অবশ্য অনেকে বলেন, সহকর্মীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের কারণেই তার চাকরি যায়। ইংল্যান্ডের সংবিধানের মতোই শফিক ভাইয়ের সংবিধান অলিখিত। সেই সংবিধান মোতাবেক কলিগদের মধ্যে প্রেম জনিত বিয়ে নিষিদ্ধ। লাভ রোডের বিখ্যাত লাভার ম্যানের অফিসের এই অবস্থা। ভাবতেই অবাক লাগে। যতোই ভালোবাসা সংখ্যার সেক্সি গল্প ছাপুন, আর সঠিক বানানে ইংরেজি লিখুন, এইসব ব্যাপারে শফিক ভাইয়ের রক্ষণশীলতা ছিল অতুলনীয়।
সেক্সি গল্প ছাপা হতো স্রেফ বিক্রির জন্য। পসার বাড়াতে। বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমানের যৌনজীবন নিয়ে গবেষণা করতে যায়যায়দিনে বিশেষ সংখ্যাগুলো হাতে থাকা উচিত। একেকটা সংখ্যায় গল্প আসতো হাজার হাজার। অধিকাংশই প্রেম, যৌনতা, অবৈধ সম্পর্কের। শফিক রেহমান তো এইভাবে লিখতে বলতেন না। তারপরও এরকম হাজার গল্প আসতো। গল্প লেখকরা এইটুকু জানতেন যে, এগুলো ছাপা হতে পারে। ব্যস।
শফিক রেহমানকে দোষ দিয়ে কী লাভ। যৌবনজ্বাল তো শফিক ভাই চালান না। এইটা কারা টপ রেটেড সাইট বানায়া রাখছে?
এখানে জানিয়ে রাখি, শফিক ভাই দৈনিকটাকে পারিবারিক পত্রিকা বানাতে চেয়েছিলেন। ফলে, সেক্সি গল্প ছাপতে নিষেধ করতেন। আমি বহু গল্প ছেপেছি। চুমোটুমো কেটে দিয়ে।
শফিক ভাইয়ের গর্বের মিডিয়াপ্লেক্সকে তার বাল্যবন্ধু আবদুল গাফফার চৌধুরী নাম দিয়েছিলেন শাদ্দাদের বেহেশত। আমরা এই দুজনকে শত্রু ভাবতেই অভ্যস্ত। কিন্তু গত বছর মি. চৌধুরী দেশে এসে যায়যায়দিনে এলে দেখা গেল, এইসব বানানো শত্রুতার চেয়ে তাদের বন্ধুত্ব অনেক মধুর। শফিক ভাই বললেন, গাফফারের বিরুদ্ধে লেখা আমার একটা লাইনও কেউ খুঁজে দেখাতে পারবে না। যায়যায়দিনে অনেক কথা লেখা হয়েছে, কিন্তু সে লেখাগুলোর একটাও শফিক ভাই লেখেন নি। গাফফার চৌধুরীকে শফিক ভাই অনেক বড় কলামিস্ট মনে করেন। আর উনিও শফিক ভাইকে অনেক বড় সম্পাদক মনে করেন এইটাই সেদিন দুজনের কথায় মনে হয়েছিল। গাফফার চৌধুরীকে ধরে ধরে সেদিন তিনি পুরো মিডিয়াপ্লেক্স ঘুরিয়েছিলেন। যে কেউ এলেই ঘোরাতেন। সব দেখাতেন। এমনকি টয়লেটও। সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন টয়লেটের দিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে যেতাম যে, অন্যের টাকায় গড়া এই ভবন নিয়ে তার এত গর্ব স্বাভাবিক কি না। বহু ভেবে যায়যায়দিন প্রজেক্ট সম্পর্কে একটা কথাই আমার মনে আসে। ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট। ভবন, প্রেস, ডেকোরেশনের সব টাকাই বসুন্ধরা দিয়েছে। সাংবাদিকদের বসিয়ে দুইবছর বেতন দিয়েছে। পত্রিকা চালুর পর সব খরচ জুগিয়েছে। সাতটা ম্যাগাজিন বের করার বিপুল ব্যয় নির্বাহ করেছে। অথচ কোথাও তাদের কোনো নাম নেই, ক্রেডিট নেই। শুধু কিছু বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। প্রিন্টার্স লাইনে তাদের নাম নেই। তারা প্রকাশক না। অথচ সবাই ভাবতো তারা দিনের পর দিন বেতন-ভাতা দিয়ে যাবে। কী অবাক এক চুক্তি? এর চেয়ে রহস্যময় ডিল বাংলাদেশের ব্যবসা জগতে আর হয়েছে কি না জানা যায় না।
ফলে, বিপদে পড়ে বসুন্ধরা যখন যায়যায়দিন ছেড়ে দিল। যায়যায়দিনও বসুন্ধরাকে ছেড়ে দিল তখন কেউ অবাক হননি। এটা ঘটার ছিল। আর রহস্যময় এই ডিলে গড়া মিডিয়াপ্লেক্সও যে শফিক ভাই রাখতে পারবেন না এটাও জানা ছিল। শুধু ঘটনা ঘটার অপেক্ষা। ভিতরে আমরা যারা কাজ করতাম তাদের জন্য এটা ছিল অসহনীয় এক পরীক্ষা। শফিক ভাই বাংলাদেশের সংবাদজগতের উজ্জ্বলত ১০৪ জন সাংবাদিককে বরখাস্ত করেছিলেন সংবাদপত্র জগতের এক সংকটময় সময়ে। নতুন কোনো ইনভেস্টমেন্ট বা উদ্যোগ আসার সম্ভাবনা তখন ছিল না। ফলে, এই সাংবাদিকরা তাদের অতীতের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। শফিক ভাইয়ের এই কীর্তি সব সাংবাদিককে কোনো না কোনো ভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু শফিক ভাইয়ের কাছে, এটা স্রেফ ছেলেখেলার মতো বিষয় ছিল। তার অভিব্যক্তিতে কখনো এর জন্য অপরাধবোধ দেখা যায়নি। যাদেরকে তিনি বড় অফার দিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে ডেকে এনেছেন তাদেরকে এক রাতের নোটিশে চাকরিচ্যুত করে বৃটেন পাড়ি জমানোর উদ্যোগ কেমন? লোকে বিষয়টিকে কোনোদিনই ভালভাবে নেয়নি। ওই রাতে শফিক ভাই চূড়ান্ত অপদস্ত হয়েছিলেন। হিরো থেকে জিরোতে পরিণত হয়েছিলেন। জিরোতে পরিণত হওয়ার বোধটা তাকেও আচ্ছন্ন করেছিল। পরের দেড় বছর একবারের জন্য বিদেশ না গিয়ে অনেক অসুবিধার মধ্যেও তিনি যায়যায়দিনে পড়ে ছিলেন শুধু জিরো থেকে পয়েন্ট জোগাড় করে উপরে উঠতে। কিছু পয়েন্ট জোগাড় করতে পেরেছেন বলেই এখন মনে হচ্ছে।

http://goodbyesomewhereinblog.blogspot.com/2009/03/blog-post_1193.html

আমার জীবনের চন্দ্রবিন্দুহীন বছরগুলো : দি যায়যায়দিন ইয়ারস (পার্ট ফাইভ)

সেবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার আগে দশবার ভেবেছিলাম যাবো কি যাবো না। ছুটি ঘোষণার আগেই শোনা যাইতেছিল ৩০ জন কি ৫০ জন কি ১০০ জনের লিস্ট তৈরি হইতেছে। লিস্ট হইতেছে, স্যাক হইতেছে এইগুলা যায়যায়দিনের নিয়মিত গসিপের অংশ ছিল। তারপরও ব্যাপারটা মনে কিছু ভয় ধরাইতো। সেইবার গসিপগুলা কেমন জানি পাকায়া আসতেছিল। দোনামোনা করে ঈদের ছুটি কাটায়া বাড়ি গেছিলাম। ফিরেও আসছিলাম ঈদের পরের দিন রাইতে। সকাল বেলা সমকালের এক কলিগ ফোন দিলেন, উনি লাভ রোড দিয়া অফিস যাইতে গিয়া বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে যায়যায়দিন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে এই নোটিশ দেখছেন। শুনছেন ১০৪ জনকে বরখাস্ত করা হইছে। সঙ্গে সঙ্গে রাইসু ভাইকে ফোন দিলাম। উনি কইলেন, যা শুনছেন ঠিকই শুনছেন। দুপুর বেলা এক জায়গায় দাওয়াত আছে, গেলে চইলা আসেন। সমস্যা মোকাবেলার রাইসু ভাইয়ের নিজস্ব পদ্ধতি আছে। কারো মাথায় আসবে না এইরকম একটা প্রসঙ্গ থেকে উনি আলাপ শুরু করেন। টেনশন নিয়া তার কাছে ছুইটা গেলাম। খোঁজ নিয়া জানা গেল, স্যাক হওয়া সাংবাদিকরা যায়যায়দিনের সামনে। আমরা যাইতে যাইতে ওনারা ইস্কাপনের টেক্কায় চইলা গেছেন। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা ইস্কাটনে পৌঁছাইতে পারলাম। সেইদিন জানা গেল না, পরের দিন জানা গেল আমার চাকরি যায় নাই, রাইসু ভাইয়ের চাকরি গেছে। আন্দোলন করতেছি, সবার সঙ্গে আছি কিন্তু মনে মনে এইটা বুঝতেছি রাস্তা আলাদা হয়া যাইতেছে। মিডিয়ার বাজার খারাপ। এইসময় চাকরি গেলে এখনই কেউ চাকরি পাবে না। যারা চাকরি ছাড়ছে তারা ক্ষতিপূরণ পাবে। কিন্তু আমি নিজে থেকে চাকরি ছাড়লে কিছুই পাবো না।
তীব্র অপরাধ বোধ আর লজ্জা নিয়ে দুই/তিনদিন পর যায়যায়দিনে জয়েন করার দিনটা আমার জীবনে সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর একটা। কেউ যদি যায়যায়দিনের জীবনে আমার সবচেয়ে আনন্দময় সময়গুলার কথা জিগান তাইলে আমি বলবো, হ্যাঁ ব্রাত্য রাইসুর সঙ্গে কাজ করার সময়টা। ব্লগে একবার রাইসু ভাই পোস্ট দিয়া আমার চলতি ভাষার ডিকশেনারি করার উদ্যোগকে শুভেচ্ছা জানাইছিলেন। আমি মনে করলাম ব্রাত্য রাইসু এইরকম শুভেচ্ছা জানাইছেন তো আমার বিষয়টারে ক্লিয়ার করা দরকার। চলতি ভাষা চর্চায় ওনার অবদানটা বইলা ফেলি। একটা পোস্ট দিতেই সবার গাত্রদাহ শুরু হইলো। আমি আনন্দের সঙ্গে পাঁচটা পোস্ট দিলাম। অনেকেই এখনও সেই পোস্টগুলার রেফারেন্স দেয় এই বইলা যে, আমি বুঝি ব্রাত্য রাইসুকে তেল দিছি। সম্ভবত রাইসু ভাইও এইটা মনে করেন। কনটেন্ট রাইখা, মোটিভ দেখার প্রবণতার কারণেই এই মিস রিংডিং হইছে বইলা আমার ধারণা। আমার বক্তব্য পরিষ্কার, রাইসু ভাই জানে, আমি এডিটোরিয়াল ছাইড়া সাহিত্য পাতায় আসার জন্য আগ্রহী আছিলাম না। যায়যায়দিনের এডিটোরিয়ালেই আসতে চাইছিলাম। রাইসু ভাইয়ের আগ্রহেই সাহিত্যে গেছি। আমার ধারণা, নিজের পাতার জন্য আমার চেয়ে ভাল সিনিয়র সাব-এডিটর উনি পাইতেন না।
পিয়াল একাধিকবার ব্লগে লিখছে, আমি রাইসু ভাইরে সরায়ে দিয়া সাহিত্য সম্পাদক হইছি। আমি ভাবছি, আর কেউ না হউক রাইসু ভাই এইটার প্রতিবাদ করবে। কারণ, কাউরে সরায়া দেওয়ার মতো সখ্যতা কখনোই শফিক রেহমানের সঙ্গে আমার হয় নাই। পরন্তু ১০৪ জন চাকরিজীবীর মধ্যে শুধু একজনের ক্ষেত্রে সরায়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক। ১০৪ জনকেই যদি থেকে যাওয়া কেউ না কেউ সরায়ে দেওয়ার এন্তজাম করে তাইলে ঈদের আগেই যায়যায়দিনে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার কথা। তা হয় নাই। বরং কিচেন কেবিনেটের সদস্যরা ছাড়া বাকী সবাই একাট্টা ছিলেন এইটাই আমি জানি।
১০৪ জনের সঙ্গে আমার চাকরি গেল না। পরে অনেকের চাকরি হইছে গেছে। আমার যায় নাই। এইরকম কয়েকজন ছিলেন। আমরা নিজেদের আদু ভাই বলতাম। বলতাম, সবাই পাশ কইরা যাইতেছে আমরা খালি পুরান ক্লাশে থাইকা গেলাম। কেন গেল না, এইটা একটা রহস্য। একবার দেখলাম, চাকরি যাওয়ার এন্তজাম শেষ। আমার ম্যাগাজিনের ম্যাটার আমার অজান্তে কম্পোজ হয়া তৈরি হয়ে গেছে। আমি প্রমাদ ও পাওনা টাকার হিসাব গুনতে থাকলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গেল না। কয়েল জ্বালানোর আন্দোলনের পর ভাবলাম, এইবার যাবে। গেল না। তিন মাসের বকেয়া বেতন আদায়ের আন্দোলনে জেনারেল মিটিংয়ে গরম বক্তৃতা দেয়ার পর ভাবলাম, এইবার ক্ষমা নাই। কিন্তু সে বারও গেল না। শফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল না, নিয়মিত ওঠা বসা ছিল না। তারপরও এই চাকরি না যাওয়ার ঘটনা থেকে আমার ধারণা হইছে উনি আমারে পছন্দ করেন। আমিও ওনারে পছন্দ করি। যায়যায়দিন ছেড়ে আসার দিন তার কথা মনে হয়েই আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। আমি তার অনেক কাজ অপছন্দ করেছি, তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে পছন্দ করি। উনি না চাইলে, যায়যায়দিন থেকে কয়েকবার আমার চাকরি চলে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল।
চাকরি গেলে চাকরি হয়তো পেতাম। বাজার ছোট হয়ে এসেছে, নতুন উদ্যোগ নাই, তারপরও অনেকেই অনেক জায়গায় কাজ পেয়েছেন। আমিও হয়তো পেতাম। কিন্তু শত সমস্যার মধ্যেও ভাবছিলাম, নতুন একটা উদ্যোগ হোক তারপর চাকরিটা ছাড়ি। কিন্তু গণতন্ত্রের মতো সংবাদপত্রের নতুন উদ্যোগও অনেক দূরে।
বলছিলাম রাইসু ভাইয়ের কথা। খুব কম সময় আমরা কাজ করেছি। এরই মধ্যে মতান্তর হইছে, অমত হইছে কিছু সময় কিন্তু কখনো সময় নিরানন্দ কাটে নাই। গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতাম আমরা। একসঙ্গে খানাপিনা করতাম। সবচেয়ে মজার ছিল গভীর রাত পর্যন্ত মেকাপ করা বিষয়টা। গ্রাফিক্সের মেহেদী ভাই, আমি আর রাইসু ভাই মিলে বেশ কয়েক সপ্তাহ সারারাত করে মাঝে মাঝেই ভোর রাতে বাড়ি ফিরতাম। ফুরফুরে হাওয়ার সকাল বেলার ঢাকা শহর দিয়ে বাসায় ফিরে বিকাল পর্যন্ত ঘুমাতাম। সন্ধ্যায় আবার অফিসে যেতাম। সেই আমেজটা এখনও মনে পড়ে।

আমার জীবনের চন্দ্রবিন্দুহীন বছরগুলো : দি যায়যায়দিন ইয়ারস (পার্ট থৃ/থ্রি)

শফিক ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ জমলে তিনি মাঝে মাঝে স্মৃতিচারণ করতেন। জহির রায়হান তার বন্ধু ছিলেন। জহির রায়হানকে নিয়ে তিনি মূল্যবান কিছু তথ্য দিয়েছিলেন। আমি তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম তিনি যেন এগুলো নোট আকারে হলেও কিছু কিছু লিখে রাখেন।
শফিক রেহমানের বাবা সাইদুর রহমান ছিলেন শেখ মুজিবের শিক্ষক। ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে মিছিল ও গাড়ি বহর পথে একটা জায়গাতেই থেমেছিল, সাইদুর রহমানের বাসার সামনে। এটা শফিক ভাই বলেছিলেন। পরে শেখ মুজিব শফিক রেহমানকে ডেকে নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে একটা মজার সাক্ষাৎ হয়েছিল শেখ মুজিবের।
সত্তরের দশকে শফিক ভাই হোটেল শেরাটনে অ্যাকাউন্টস সেকশনের দায়িত্বে ছিলেন। তখনকার রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল শেরাটন হোটেল। সে সময়ের অনেক কথা বলতেন শফিক ভাই।
আবদুল গাফফার চৌধুরীর আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি লেখার সঙ্গে শফিক ভাই কীভাবে জড়িত ছিলেন সেটা তিনি নিজেই লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে তার দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের কথা কোথাও লিখেছেন বলে দেখিনি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড মুজাফফর আহমদকে নিয়ে কথা বলতেন তিনি। তাদের নিয়েও কিছু লেখেননি।
পঞ্চাশের দশকে নতুন ঢাকা শহরে শিক্ষিত ঘরে যে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবীরা তৈরি হচ্ছিলেন তাদের একজন শফিক ভাই। বাংলাদেশের এখনকার চেহারা তাদের চোখের সামনেই গড়ে উঠেছে। অনেক বিষয়ে শফিক ভাইয়ের পর্যবেক্ষণ আমার কাছে নিরপেক্ষ মনে হয়েছে। তার দেখার একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
নানা আড্ডার পর আমি তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তিনি যেন আত্মজীবনী লেখেন। এবং সেটার ধরন বিচার করে আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমার সম্পাদিত আর্ট অ্যান্ড কালচারেই যেন সেটা লেখেন। তিনি রাজি হননি। শুধু বলতেন, এখনও সময় হয়নি। আগে অবসরে যাই তারপর লিখবো। শেষ পর্যন্ত আমি বলেছিলাম তিনি যেন আমাকে একটা সাক্ষাৎকার দেন। নিজের পত্রিকার একজন সাংবাদিককে তিনি কীভাবে সাক্ষাৎকার দেবেন, এই প্রশ্ন তিনি আমাকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। শফিক ভাইয়ের প্রতি আমার সমস্ত সমালোচনা সত্ত্বেও আমি মনে করি, তার বর্ণাঢ্য জীবনের কাহিনী শুধু নিকটবর্তী মানুষের জানা থাকা দরকার তা-ই নয়, লিখে বই আকারে সেটা প্রকাশ করা উচিত।
শফিক ভাই গল্প লিখতেন। সাহিত্যের প্রতি তার প্যাশন প্রচণ্ড। সম্ভবত সাহিত্যিকই হতে চেয়েছিলেন। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট পেশায় ছিলেন বটে, কিন্তু নেশায় লেখক ছিলেন। সন্ধানী-ইত্তেফাক থেকে শুরু করে সাম্পাহিক যায়যায়দিন দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাধর মানুষগুলোর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে। সাপ্তাহিক যায়যায়দিনের রমরমা অবস্থায় যায়যায়দিনকে কেন্দ্র করে তিনি অনেককে একত্রিত করেছেন। যাদের লেখার কথা ছিল না তাদের লিখিয়েছেন। যাদের বলার কথা ছিল না, তাদের বলিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন যেন কেউই আর তার পাশে থাকেন নি। কেন কে জানে? যখনই কোনো বুদ্ধিজীবী মার্কা লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে দেখেছি তারা শফিক ভাই সম্পর্কে ভাল কথা কেউ বলেননি কখনো। বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল, আওয়ামী পন্থীরা তাকে সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তরুণরা খুব সহজেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রথম আলাপে।
শফিক ভাই শুধু আমাদের নয়, পুরো পত্রিকা জগৎকেই একটা কথা খুব ভালোভাবে শুনিয়েছেন, সেটা হলো : তরুণদের কথা শুনতে হবে। তাদের স্পেস দিতে হবে। বাংলাদেশের পুরনো আমলের সাংবাদিকতা, চিন্তচর্চায় সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বড় ধরনের একটা বাড়ি দিয়েছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। না যায়যায়দিনের বিশেষ সংখ্যায় গল্প লিখে গত পনের বিশ বছরে কেউ বড় লেখক বা উপন্যাসিক হয়েছেন বলে আমার জানা নেই। কিন্তু কলাম লিখে অনেকেই বড় কলামিস্ট হয়েছেন এটা নিশ্চয় করে বলা যায়। শফিক ভাই তরুণদের কথা শুনতেন, আইডিয়াগুলো নিতেন। স্পেস দিতেন। নতুন চিন্তা ও আইডিয়ার জন্য তিনি সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু একথাও পাশাপাশি বলে রাখতে হবে, তিনি মুদ্রদোষের মতো প্রায় সবাইকে বলতেন, আমার কথা তোমাদের শুনতে হবে। তোমরা কিচ্ছু জানো না। আমি জানি। আমি দেখেছি।
ভাগ্য বলে কি কোনো ব্যাপার আছে। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে, দৈনিক পত্রিকা শফিক ভাইয়ের ভাগ্যে নেই। প্রথমবার তার সম্পাদিত দৈনিক যায়যায়দিন প্রতিদিন চলেছিল ৩৪ দিন। তিনি লিখেছিলে, তার আইডিয়ার পরাজয় হয়েছে। এবার দৈনিক যায়যায়দিন তো বেরই হচ্ছিল না। আর বের হওয়ার পর সপ্তাহে সপ্তাহে বন্ধ হওয়ার জল্পনা শোনা যেত।
মনে আছে, যায়যায়দিন প্রকাশের দুইদিন আগে আমি আর রাইসু ভাই সিএনজি করে শাহবাগ যাচ্ছিলাম। হঠাৎ রাইসু ভাইর মনে হলো অমঙ্গলজনক ৬/৬/৬ তারিখে যায়যায়দিন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। তিনি বললেন, আপনার কি মনে হয় এই বিষয়টা নিয়া শফিক ভাইরে সাবধান করা উচিত? আমি হাসতে হাসতে শেষ। রাইসু ভাই সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে শফিক ভাইকে ব্যাপারটা জানালেন। যথারীতি শফিক ভাই সে কথাটায় কোনো গুরুত্ব দেননি। না দেয়াটাই ভালো হয়েছে। কিন্তু আমরা যারা যায়যায়দিনে দুই বছর কাজ করলাম তাদের জন্য অমঙ্গলময় দুটো বছর গেছে নিশ্চয়ই। প্রতিটি মাসের বেতন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেউ এমন একটা মাসের কথা বলতে পারলে কৃতার্থ হবো যে, ওই মাসের বেতন হওয়া নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। ঈদের বন্ধের ছুটিতে ১০৪ জনের চাকরি যাওয়ার পর, ঈদের বন্ধগুলো ছিল বিভীষিকার মতো। আমরা ভাবতাম, এইবার এই ছুটিতেই পত্রিকা বন্ধ হবে। অথবা বড় ধরনের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটবে। অথবা শফিক ভাই পদত্যাগ করে লন্ডনে পাড়ি জমাবেন। অঘটন অনেক ঘটেছে। একের পর এক। একজন এসেছে। আবার চলে গেছে। শফিক ভাইকে দেখেছি সংকট ঘনায়ে এলেই লিখতে বসেছেন। দীর্ঘ দীর্ঘ লেখা তৈরি করতেন। শফিক ভাই প্রতিদিনই গাদাগাদা লেখা লিখতেন। প্রচুর অনুবাদ করতেন। লেখা এডিট করতেন এবং নিজের হাতে ভাল প্রুফ দেখতেন। এত সক্রিয় এত প্রোঅ্যাকটিভ সাংবাদিক বাংলাদেশে আর একজন দুইজন আছেন কি না সন্দেহ। প্রতিদিন সকাল বেলা ব্যাগ ভরে বাইরের পত্রিকার কাটিং এনে তিনি সহকর্মীদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে বিতরণ করতেন। আলাপ করতেন। তার রুমে যাওয়ার প্রবেশাধিকার অবারিত ছিল। মতাদর্শিক ব্যাপারে তিনি কট্টরপন্থী ছিলেন না। বিএনপিকে সমর্থন করলেও মনেপ্রাণে আবহমান বাঙালি চেতনায় বিশ্বাস করতেন। বলতেন, আমার আর প্রগতিশীল হওয়ার দরকার নেই। আমি জন্ম থেকেই প্রগতিশীল। শফিক ভাইয়ের লেখা আমি পছন্দ করি কলেজ জীবন থেকে। সহজ ভাষায়, প্রচুর তথ্য-উপাত্ত ঘটনা দিয়ে গল্পের আকারে রাজনৈতিক কলাম লেখার একটা দারুণ কৌশল রপ্ত তার। হিউমার আর উইটে পরিপূর্ণ। এ রকম করে কেউ কেউ কলাম লেখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পারেননি। তার গদ্য কনভিন্সিং। পড়লে একমত হতে ইচ্ছা করে।
ভাল কলামিস্ট, ভাল সাংবাদিক অবশ্যই তিনি। কিন্তু চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হওয়া সত্ত্বেও মানেজমেন্টে তিনি ভয়ানকভাবে ব্যর্থ। দেশ-বিদেশের অনেক কিছু জানলেও ভাল প্রতিষ্ঠান গড়ার শর্তগুলো তিনি জানেন না। সফল সাপ্তাহিক চালালেও ভাল দৈনিক কিভাবে গড়ে ওঠে সে খবর তিনি নেননি। কিন্তু ওভার কনফিডেন্ট ছিলেন যে তিনি সফল হবেন। না, তিনি সফল হননি। শফিক ভাইয়ের সাফল্য থেকে যেমন আমাদের শেখার আছে। তার ব্যর্থতা থেকেও তেমনি শেখার আছে।

কৃতজ্ঞতাঃমাহবুব মোর্শেদ
http://goodbyesomewhereinblog.blogspot.com/2009/03/blog-post_8216.html