সোমবার, ২০ আগস্ট, ২০১২

আনন্দ-বিষাদের ঈদ


হয়তো কোন গবেষণা কিংবা জরিপ হয়নি,তবে অনেকটা অনুমানের উপর জোর দিয়ে বলা যায় ,পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভবত শুধু একটা উৎসবকে কেন্দ্র করে এতগুলো মানুষ প্রিয়জনের সাথে ঈদ করার জন্য বাড়ির পানে ছুটে না।কত বিড়ম্বনা আর ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়ে এতগুলো মানুষ বাড়ি পৌছায়,সেটা প্রতি বছর পত্রিকাগুলো দেখলেই বুঝা যায়।বিড়ম্বনা যদি এতটুকুই হত তাহলে কথা ছিল না,কিন্তু এর সাথে যোগ হয়েছে বাস খাদে পড়া কিংবা লঞ্চডুবিতে সলিল সমাধি অথবা অজ্ঞান-মলম পার্টি।এত সব বাঁধা পেরিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দটা নিশ্চয় বলে বোঝান যাবে না।তা না হলে রীতিমত জীবনঝুঁকি নিয়ে এতগুলো মানুষ শহর ছাড়ত না।কারো কারো জন্য এই বাড়ি ফেরাটা অনেকটা মাটির বুকেও ফেরার মত।সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক প্রতিবার এই সব সমস্যা দেখে সমাধানের গলাবাজি করেন আর মানুষের দুর্ভোগ বাড়ান। বছর গড়ায়,দুর্ভোগ আর কমে না।


কৃতজ্ঞতাঃপ্রথম আলো
আমাজন জঙ্গলে নাকি এমনও জায়গা আছে যেখানে কখনই সূর্যের আলো কখনো পৌঁছে না অর্থাৎ সেই অরণ্য এতটাই ঘন যে মাটিও ভেজা ভেজা থাকে।ঈদের আনন্দটাও বোধহয় কারো কারো কাছে আমাজন জঙ্গলে সূর্যের আলো পৌঁছাবার মত।এমন যাদের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে তাঁদের একদম প্রথমেই আছে বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানার শিশুদের কথা।এতিম বাচ্চারা হয়তো আশ-পাশ দেখে নিজের প্রিয়জনকে খুঁজে বেড়ায় এবং হয়তো একটা সময় উপলব্ধি করতে পারে এই জগত সংসারে আসলে তাদের আপনজন বলতে কেউ নেই।খুব খারাপ লাগে যখন দেখি একদল অনাথ শিশুর জন্য সরকার থেকে বরাদ্দকৃত টাকা শিশুসদনের তত্ত্বাবধায়করা লুটে-পুটে খাচ্ছেন।এমন অনাথ শিশুদের ভাগের টাকা খাওয়ার সাধও মানুষের মনে জন্মে।জগত এমনই নিষ্ঠুর!
সেদিক থেকে বৃদ্ধাশ্রম নিবাসীরা হয়তো আরএকটু বেশিও দুর্ভাগা।বৃদ্ধাশ্রমে যারা থাকেন তাঁদের অধিকাংশই সমাজের আর দশটা মানুষের চাইতে তুলনামূলক ভাবে সচ্ছল-ই বলা যায়।সন্তানদেরকে “মানুষ” বানিয়ে সন্তানদের থেকেই দূরে থাকতে হয়।বৃদ্ধাশ্রমের অধিকাংশ বৃদ্ধই ঈদের সময়টাতেও সন্তানদের কাছ থেকে সাড়া পান না।কেউ তো বাবা মা কে বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দিয়েই “খাল্লাস”! একে নিয়তি না বলে উপায় কি?একটা কথাই শুধু মনে পড়ে,এক বাবা-মা দশটা বাচ্চাকে লালন-পালন করতে পারে কিন্তু দশজন বাচ্চা মিলে এক বাবা-মা কে পরিচর্যা করতে পারেনা!
ঈদ মৌসুম সামনে আসলে শুরু হয় আরেক “অশ্লীলতা”-জাকাত দেওয়ার নামে জীবন কেড়ে নেওয়া।জাকাত নিতে গিয়ে চিরতরে আল্লাহর কাছে চলে যাওয়ার ঘটনা এখন আমাদের রীতিমত গা সওয়া।এইসব নিয়ে আমরা আর ভাবি না।কর্পোরেটরা তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে গিফট নিয়ে সুযোগ-বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছে দিয়ে “দাতার” ভাব নেয়।দশ টাকা দান করতে খরচ দশ হাজার টাকা!চুতিয়া কর্পোরেট,চুতিয়া কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি(CSR)
মেঘ কিংবা সাইয়ারা কিভাবে ঈদ উদযাপন করবে সে খবর আমাদের জানা হয়েছে বহু আগেই।নিষাদ-নিনিত ও হয়ত ঠিক বুঝে উঠতে পারবে না এবারের ঈদ কেন তাদের কাছে গতবারের কাছ থেকে আলাদা।অপেক্ষা তাদের হয়তো ফুরাবে না।
আমাদের বলার জায়গা কিংবা ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ।এইসব কিছুই সাথে নিয়ে বেঁচে আছি,ঈদ উপভোগ করি।ঈদ আনন্দ দোলা দিবে সবার মনে কিংবা বছরের প্রতিদিনই হোক ঈদের দিনের মত- এমনটা আশা করি না।তারপরেও ঈদ তো বছরে দুইটাই।ঈদ আসবে যথা নিয়মেই আর সেই সাথে হয়তো ধুয়ে নিয়ে যাবে আমাদের সব দুঃখ-হতাশা-গ্লানি।
কৃতজ্ঞতাঃhttp://amibangladeshi.blogspot.com/


ঈদের শুভেচ্ছা সবাইকে।সবার জীবন আনন্দময় হোক

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১২

ও বন্ধু আমা(দে)র


মানবসভ্যতার একেবারে “দোলনা”লগ্ন থেকে সবসময়ের সঙ্গী হয়ে ছিল কুকুররা।নিজেদের বিশ্বস্ততা-ভক্তি দিয়ে কুকুর জায়গা করে নিয়েছে উপকথা আর ইতিহাসের পাতায়।এমনকি তাদের স্থান হয়েছে কোরআন-বাইবেলের মত ধর্মগ্রন্থেওসচেতন পাঠক মাত্রই জানেন আসহাবে কাহাফের দলের কথা।এমন অনেক প্রচলিত কথা আছে যেখানে প্রভুর আনন্দের সময়ে কুকুর নিজের লেজ নেড়ে আনন্দে সামিল হয়েছে ঠিক তেমনি বিপদের সময়ে নিজ প্রাণ বিপন্ন করে চেষ্টা করেছে ট্র্যাজেডি ঠেকাতে।পারস্পরিক সহযোগিতার এই ১৫০০০ বছরে এমন কোন শক্তিশালী প্রমাণ কি আছে যেখানে কুকুরের মানুষের সুখ-দুঃখ বুঝতে পারার কারণ ব্যাখ্যা করা যায়?সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে কুকুরের এই লেজ নাড়ার পেছনে আসলেই গভীর কিছু কাজ করে।
অতীত গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে প্রাণীরা সহানুভূতি অনুভব করতে পারে।ইঁদুর ও বানররা তাদের স্বগোত্রীয়দের ইলেকট্রিক শক থেকে বাঁচাবার জন্য নিজেরা খাবার খাওয়া থেকে বিরত ছিল বলে দেখা গিয়েছিল।অনুরূপভাবে গরিলারাও বিভিন্ন সংঘাতের সময় একে অন্যকে শান্ত করতে চেষ্টা করে বলে সাম্প্রতিক এক ডকুমেন্টারিতে দেখা গেছে।আসলে এই সব পরীক্ষণ প্রমাণ করে যে প্রাণীরা স্বপ্রজাতির অন্য সদস্যদের বিপদে অনুভূতি প্রকাশ করে এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ায়।লন্ডনের গোল্ডস্মিথস কলেজের ডেব্রাহ কাস্টেন্স ও জেনিফার মেয়ার দেখতে চেয়েছিলেন যে কুকুররা কি সত্যিই মানুষের আবেগের বিভিন্ন স্তরগুলো সনাক্ত করতে পারে কি না? 
গোটা ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করতে ডঃ কাস্টেন্স এবং মিস মেয়ার এক পরীক্ষার আশ্রয় নেন যেখানে তারা দেখতে চান একজন মানুষ যদি কাছে কোথাও হঠাৎ কান্না শুরু করেন তবে কুকুরের প্রতিক্রিয়া কি হয়?গবেষকরা জানতেন যে কুকুরদের আচরণগুলো ব্যাখ্যা করা কষ্টকর হবে তারপরও তাদের করা আচরণগুলো ছিল ঘ্যানঘ্যান করা,নাক ঘষা,জিহ্বা চাটা,কোলে মাথা রাখা এমনকি কুকুরেরা সে সময় কান্নারত মানুষের জন্য খেলনাও ছিনিয়ে আনছিল।যদিও এমন আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল কুকুরটি মানুষ যাতে শান্ত হয়,এমন কিছু করার চেষ্টা করছিল।কিন্তু এই আচরণ একই সাথে কুকুরটির কৌতুহলের চিহ্ন হতে পারে অথবা এটাই প্রমাণ করে যে প্রভুর বিপর্যস্তকালীন সময়টাতে কুকুরও বিষাদগ্রস্থ হয়।
এই পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে গবেষকগণ বিভিন্ন প্রজাতির ১৮ টি কুকুরকে ২০ সেকেন্ড সময়কালের চারটি বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে পর্যবেক্ষণ করেন।এই পরিস্থিতি চারটি ছিল কুকুরগুলোর মালিকের কান্না,কুকুরগুলোর কাছে অপরিচিত এমন একজনের কান্না এবং উভয়ে আলাদা আলাদা ভাবে গুনগুণ করে “ম্যারি হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব” ছড়াটি আবৃত্তি করে শোনানো। এই চারটি অবস্থা কুকুরগুলো যাতে আলাদা করতে পারে সেজন্য মিস মেয়ার এবং কুকুরগুলোর কাছে অপরিচিত ব্যক্তিটি এবং কুকুরের মালিক দুই মিনিটের এক আলাপচারিতায় অংশ নেন।
ডঃ কাস্টেন্স এবং মিস মেয়ার ধারণা করেন যে,যদি কান্নার অস্বস্তিকর পরিবেশ কুকুরকে বিষাদগ্রস্থতায় আক্রান্ত করে,তাহলে কে কান্না করছে সেটা ব্যাপার না বরং সে তার মালিককে সান্ত্বনা দিতে ছুটে যায়।তাঁরা এই সিদ্ধান্তেও উপনীত হন যে যদি কুকুরদের মাঝে দুঃখ-কষ্টের অনুভূতির চাইতে কৌতুহলের প্রাধান্য বেশি হত,তবে গুনগুন করে ছড়া বলার সময়ও কুকুরেরা প্রতিক্রিয়া দেখাত।

“এনিমেল কগনিশন” ম্যাগাজিনে করা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন  কুকুরের মালিক কিংবা  কুকুরের কাছে অপরিচিত কেউ যখন গুনগুন করে ছড়া কাটে তখন কুকুরদের “ব্যক্তি-নির্ভর আচরণ”  কখনো কখনো প্রকাশ পায়।কিন্তু এই ঘটনা দ্বিগুণ ঘটতে শুরু করে যখন কেউ কাঁদতে শুরু করে।এই ঘটনা এটি প্রমাণ করে যে কুকুররা অদ্ভুত আচরণ এবং কান্নার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।১৫টি কুকুরের উপর চালানো এই পরীক্ষণে দেখা যায়,যখন অপরিচিত কেউ কাঁদতে শুরু করে ,তখন সবগুলো কুকুর তাদের মালিকের চাইতে বরং অপরিচিত লোকের দিকে মনোযোগ দেয়।

এইসব উদ্ঘাটন প্রমাণ করে যে অন্যর সুখ দুঃখে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা কুকুরদের আছে।যদিও এই পরীক্ষণের ফলাফল অনেকটাই পরিষ্কার,তারপরেও ডঃ কাস্টেন্স মনে করেন এটা সত্যিকার অর্থে অন্যর দুঃখ কস্ট বুঝবার অনুভূতি কিনা তা বুঝতে আরও পরীক্ষার দরকার।তিনি আরও বলেন,এটাও হওয়া সম্ভব যে কুকুররা হয়তো পুরস্কার পাওয়ার জন্য হতাশাগ্রস্থ মানুষদের কাছে গিয়েছে।

রবিবার, ৮ জুলাই, ২০১২

সুইসাইড নোট এবং ক্রিয়েটিভিটি







১৪ বছরের ওয়েসলির চিঠিটা “প্রিয় মাকে” সম্বোধনের মাধ্যমে শুরু।যেখানে লেখা আছে সে মাকে কতটা ভালবাসে এবং একটা অনুরোধ যাতে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গাঢ় রঙ ব্যবহার করা হয়।তাতে আরও লেখা আছে তার উত্তরাধিকারী কে হবে!
 স্বভাবতই ছেলের হোমওয়ার্ক খাতায় এমন লেখা দেখে মা ভিকি ওয়াকারের মুখ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে।এক দৌড়ে চলে যান ছেলের শোয়ার ঘরে।মনে একটাই প্রার্থনা-নিজের ছেলেকে আত্মহননে নিঃশেষ করা অবস্থায় না দেখা।কিন্তু একি!ওয়েসলি যে নিজের  হোমওয়ার্ক করার তৃপ্তি নিয়ে বেশ নিরুপদ্রুব ভাবেই ঘুমাচ্ছে।আর সুইসাইড নোটটা তাৎক্ষণিক ভাবেই রূপ নেয় হোমটাস্কে!আসলে স্কুল থেকে সৃজনশীল লেখা প্র্যাকটিসের অংশ হিসেবে এই হোমটাস্ক দেওয়া হয়েছিল।স্টাফোর্ডের “ডিসকভারি একাডেমী” স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে এব্যাপারে জবাব চাওয়া হলে তাঁরা জানায়,স্কুলছাত্রদের “আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের কলা” এবং ভবিষ্যতে এরা এদের বাবা-মার সাথে কিভাবে আচরণ করে তা দেখতে চাওয়াই এই লেখার উদ্দেশ্য!এছাড়া ছাত্ররা তাদের মাকে কতটা ভালবাসে,সেটা দেখতে চাওয়া ও এই লেখার উদ্দেশ্য!প্রিয়জনকে না বলা কথাগুলোও ফুটিয়ে তোলার জন্যই এই আয়োজন।
কিন্তু যে ওয়েসলি এই চিঠি লিখেছে সে কি ভাবছে জানতে চাওয়া হলে সে জানায়,“আমার আর দশটা বাড়ির কাজের মতই একে নিয়েছি এবং আমি সেভাবেই লিখেছি।আমাদেরকে ভাবতে বলা হয়েছিল যে আমরা খুব ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছি এবং আমরা আমাদের প্রিয়জনকে কিভাবে ধন্যবাদ জানাব,সেটাই ফুটিয়ে তুলতে বলা হয়েছিল সে চিঠিতে।” অবশ্য এই চিঠি বাসায় নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও নিজ বাবা-মাকে চিঠি দেওয়ার ব্যাপারে কোন নিষেধ করা হয়নি।ওয়েসলির বাবা মিঃ ওয়াকারের অভিমত নোটের উপরে কিছু লেখা থাকলে এতো ভুল বুঝাবুঝির সম্মুখীন হওয়া লাগতো না।

সোমবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১২

সত্যিই আমরা মস্তিষ্কের মাত্র দশ ভাগ ব্যবহার করি?


প্রায় সময় আমরা বলতে শুনি যে মানুষ তার ব্রেইনের মাত্র দশ ভাগ ব্যবহার করে এবং বাকিটা অব্যবহৃত থাকে।প্রকৃতপক্ষে এটা একটা মিথের চাইতে বেশি কিছুনা।এর চাইতেও স্পষ্ট করে বললে ডাহা মিথ্যা কথা।প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের ব্রেইনের পুরোটাই ব্যবহার করি।কিন্তু বহুল প্রচলিত এই মিথের উৎপত্তি কোথা হতে কিংবা কিভাবেই বা এটি এতো প্রচলিত হল সেটা জানার চেষ্টা করবো
কোথা থেকে শুরু হল এই মিথ
১০% ব্যবহারের এই উক্তি সম্ভবত প্রচলিত হয়েছিল আলবার্ট আইনস্টাইনের এক ভুল উক্তির দ্বারা কিংবা ১৮০০ শতকে পিয়েরে ফ্লরেন্সের গবেষণা কাজের ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে।।১৯০৮ সালে উইলিয়াম জেমস লিখেছিলেন “আমরা আমাদের সম্ভাব্য মানসিক এবং শারীরিক ক্ষমতার খুব কমই ব্যবহার করি”( The Energies of Men, p. 12)
অজ্ঞাত কোন একভাবে, কেউ একজন এই মিথের প্রচারণা শুরু করেন এবং খুব আশ্চর্যজনক ভাবে জনপ্রিয় মিডিয়াগুলো এর প্রচারপ্রচারণা অব্যাহত রাখে।স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ কোন তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই তা বিশ্বাস করতে শুরু করে।প্রকৃতপক্ষে এর পিছনে কোনপ্রকার বৈজ্ঞানিক উপাত্ত নেই।বিভিন্ন বিজ্ঞাপনও এর প্রচার প্রসারে ভূমিকা রাখে।উদাহরণস্বরূপ নিচে দুটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হলঃ
একটি হার্ডডিস্ক কোম্পানির বিজ্ঞাপন
একটি এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে "প্রায়ই বলা হয়ে থাকে আমরা মস্তিষ্কের ১০ ভাগ ব্যবহার করে থাকি।কিন্তু আপনি যদি ****থেকে **** ........ Airlines এর মাধ্যমে যান,তাহলে আরও বেশি ব্যবহার করতে পারবেন।
১০% বলতে প্রকৃতপক্ষে আমরা কি বুঝি?তার মানে কি এই যে আমাদের ব্রেইনের যদি ১০% সরিয়ে বাকি নব্বই ভাগ রাখা হয়,তাহলে কি আমরা ভাল থাকবো?যদি একজন মানুষের ব্রেইনের গড় ওজন ১৪০০ গ্রাম হয় ,তাহলে তার ৯০ ভাগ সরিয়ে ফেলা হলে ওজন দাড়াবে মাত্র ১৪০ গ্রাম যা একটি ভেড়ার মস্তিষ্কের ওজনের সমান।আমরা বেশ ভালভাবেই জানি যে আমাদের ব্রেইনের তুলনামূলক ভাবে খুব ছোট একটা অংশও যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়,তবে সে ক্ষেত্রে স্ট্রোকের মত ঘটনা ঘটে যা বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন নিউরোসার্জিকাল  অসুখ যেমন পার্কিন্সন্স ডিজিজেও ব্রেইনের শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।কিন্তু এইসব আক্রান্ত স্থানের পরিমাণ পুরো ব্রেইনের তুলনায় কিছুই না।কিন্তু এর প্রভাব বেশ গভীর ভাবে পড়ে।
শরীরের অন্য অংশের তুলনায় ব্রেইন অনেক বেশি মূল্যবান।কারণ এটি পুরো শরীরের মাত্র দুই শতাংশ হলেও অক্সিজেন কিংবা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের অন্তত ২০ শতাংশ খরচ হয়।আর এর ৯০ শতাংশই যদি অপ্রয়োজনীয়ই হয় তাহলে মানুষ আরও ক্ষুদ্র এবং দক্ষ ব্রেইন নিয়ে বেঁচে থাকতো।সময়ের বিবর্তনে  অপ্রয়োজনীয় অংশ এমনিতেই বিলুপ্ত হত।
বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি যেমন  Positron Emission Tomography(PET) এবং  functional magnetic resonance imaging (fMRI) ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছে মানব মস্তিষ্ক সর্বদাই কোন না কোন ভাবে ব্যস্ত থাকে এমনকি আপনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন তখনও। শুধুমাত্র গুরুতর কোন আঘাতপ্রাপ্ত হলে সেক্ষেত্রে মস্তিষ্কে কিছু “নিষ্ক্রিয় জায়গা” পাওয়া যায়।
এক দশকেরও বেশি সময় যাবত বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে।তাঁরা এমন কোন অংশ পাননি যা কার্যত কোন কাজই করেনা।
এছাড়া আরও বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে যার ফলে খুব স্পষ্টতই বোঝা যায়,১০% মিথ পুরোটাই ভুয়া।সুতরাং এর পর কেউ যদি বলে আমরা ব্রেইনের ১০ ভাগ ব্যবহার করি তবে তাকে জোরসে গলায় বলুন,মিথ্যা !আমরা আমাদের ব্রেইনের পুরোটাই ব্যবহার করি

সোমবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১২

রিডার্স ডাইজেস্টের জন্ম



কেবল পাঠকসংখ্যাই নয়, প্রতি মাসে ২১টি ভাষায় ৫০টি সংস্করণ হওয়া এ সাময়িকী বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিয়মিত প্রকাশনা কার্যক্রমও। আজ জনপ্রিয় সাময়িকীটির বয়স ৮৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৯২২ সালের এই দিনে প্রথম 'রিডার্স ডাইজেস্ট' প্রকাশিত হয়। সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে সাময়িকীর জগতে বিপ্লব এনেছে রিডার্স ডাইজেস্ট। বর্তমানে বিশ্বের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ এর পাঠক। 
যুক্তরাষ্ট্রের ডিউইট ওয়ালেস ও লিলা ওয়ালেস দম্পতি অনেকটা শখের বশেই রিডার্স ডাইজেস্ট প্রকাশ করেছিলেন। শুরুতে এতে মৌলিক কোনো লেখা প্রকাশিত হতো না।পত্রিকায়। নিউইয়র্কে একটি গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে রিডার্স ডাইজেস্টের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয় অভিনব পদ্ধতিতে। ওয়ালেস দম্পতি সম্ভাব্য পাঠকদের কাছে চিঠি দিয়ে নিজেদের প্রকাশনার পরিকল্পনার কথা জানান এবং অগ্রিম মূল্য চান। সংগৃহীত অগ্রিম মূল্য দিয়ে প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়। 
প্রকাশের কিছু দিনের মধ্যেই রিডার্স ডাইজেস্টের পাঠকের সংখ্যা বেড়ে যায়। মাত্র সাত বছরের মধ্যে এর পাঠকসংখ্যা দুই লাখ ছাড়ায়। বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পরই মূলত এ প্রকাশনাটিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন ওয়ালেসরা। মজার মজার বিষয় নিয়ে মৌলিক লেখাও ছাপতে শুরু করেন। পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ড থেকেও রিডার্স ডাইজেস্টের একটি সংস্করণ প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে এর প্রসার বেড়েই চলেছে। শুরুতে কেবল ইংরেজি ভাষায় ছাপা হলেও বর্তমানে ২১টি ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকীটি। একই ভাষায় আবার প্রকাশিত হচ্ছে অনেক সংস্করণ। যেমন_ইংরেজিতে প্রকাশিত হলেও এশিয়ার সংস্করণের বিষয়বস্তু যুক্তরাষ্ট্রের সংস্করণ থেকে আলাদা। বর্তমানে বিশ্বের ৫০টি শহরে রিডার্স ডাইজেস্টের কার্যালয় রয়েছে। এসব শহর থেকেই স্থানীয় জনগণের উপযোগী করে সাময়িকীটি ছাপা হয়। প্রতিটি সংস্করণের জন্য পৃথক সম্পাদক রয়েছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে সাময়িকীটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে রিডার্স ডাইজেস্ট অ্যাসোসিয়েশন নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংস্থা।
রিডার্স ডাইজেস্টের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করা হয় এর সুবিধাজনক আকারকে। পাঠকদের পকেট বা ব্যাগে বহনের উপযোগী করার জন্য লম্বায় মাত্র সোয়া সাত এবং পাশে সোয়া পাঁচ ইঞ্চি আকারের কাগজে এ সাময়িকীটি ছাপেন ওয়ালেস দম্পতি। বিশ্বে এত ছোট আকারের সাময়িকী এটাই প্রথম। শুরুতে এর পৃষ্ঠা ছিল ৬৮টি। পৃষ্ঠাসংখ্যা বাড়লেও এখনো পর্যন্ত পত্রিকাটি একই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। 
ছাপার বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই পাঠকদের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে রিডার্স ডাইজেস্ট। এখন পর্যন্ত সাময়িকীটির আয়ের মূল উৎস পাঠক। এর মোট আয়ের প্রায় ৭০ ভাগই আসে সাময়িকী বিক্রি করে। তাই কখনোই বিজ্ঞাপনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়নি এ সাময়িকী। নিজদের নীতি অনুসারে কখনোই সিগারেটের বিজ্ঞাপন ছাপেনি রিডার্স ডাইজেস্ট।
১৯৭৩ সালে সাময়িকীটির সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিজদের প্রত্যাহার করে নেন ওয়ালেস দম্পতি। আশির দশকে তারা দুজনই বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। নিঃসন্তান এ দম্পতির নিয়ন্ত্রণে থাকা রিডার্স ডাইজেস্টের মালিকানার বিশাল অংশ দান করে দেওয়া হয় বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট, ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপেডিয়া।