শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৩

বদলে যাও, বদলে দাও জাতির বিবেক !!!

প্রথম আলো আমাদের প্রধান দুই দলের ভেতরকার পরিবারতন্ত্রের সমালোচনা করে ফাটিয়ে ফেলছে। ফেলুক। কিন্তু, এটাও সবিনয়ে জানতে চাই যে, সম্পাদক মতিউর রহমান সাহেবের বড়ভাই রেজাউর রহমানের উপন্যাস প্রতি বছর প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় ছাপানো, রেজাউর সাহেবের বছর বছর একাধিক বই প্রথমা প্রকাশন থেকে বের করা, সাথে সাথে মতিউর রহমানের স্ত্রী মালেকা বেগমের লেখা কলামের পাতায় নিয়মিত ছাপা, আর একাধিক বই করা ওই প্রথমা থেকেই--- এগুলা তাহলে কি তন্ত্র? 
আবার ডেইলি স্টারে প্রতি সপ্তাহেই আনিসুল হকের মেয়ের লেখা থাকে বাংলা লিখতে পারলে মনে হয় আলোতেও থাকতো।
এগুলিও পরিবারতন্ত্র নয় কি মশাই?---মুহিত হাসান দিগন্ত

তাহমিমা আনামের প্রথম বই নিয়ে প্রথম আলো সাহিত্য পাতায় যে কদর্য গুণকীর্তন দেখেছি সেটা এই জীবনে ভুলবার না। শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকীর প্রথম পৃষ্ঠায় শুধুমাত্র তিনটাই ফিচার। আর এই তিনটা ফিচারই তাহমিমা এবং তাঁর বই নিয়ে। এবং দুটো ফিচারেই তাহমিমার বড় সাইজের ছবি। একটা ফিচার ছিল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা, আর বাকি ফিচার দুটো কোন হেফাজতে ইসলামের তা আর আমার মনে নেই।

ছবিসহ এরকম নির্লজ্জ প্রোপাগান্ডা দিনশেষে প্রথম আলোর পক্ষেই করা সম্ভব।

আর তাহমিমা আনামের বিদ্যাবুদ্ধি সম্পর্কে আমার ভালোই ধারণা আছে। কেননা তাঁর একখানা গোটা এক ঘণ্টার লাইভ সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছিলাম আর তারপর কিঞ্চিৎ ভদ্রতাসূচক আড্ডা। জীবনে সত্যজিতের ফেলুদা আর যেন কী কয়েকটা বই ছাড়া জীবনে আর বাংলা সাহিত্য কিছুই পড়েন নি তিনি!

আর মতিউর রহমানের ছেলে সাশা প্রথম আলোর সুবাদে প্রেস অ্যাড বুকিংয়ের কাজে কী পরিমাণ একচেটিয়া বেনিয়াপনা করেছেন এবং করে বেড়াচ্ছেন এখনো, সেটা যারা বিজ্ঞাপন ব্যবসার সাথে জড়িত, তারা ভালো করে জানেন!

পরিবারতন্ত্রের কথা বলে সেই প্রথম আলো? পরিবারতন্ত্র তো তারা আপন অণ্ডকোষেই বয়ে নিয়ে বেড়ায়!


(onu tareq এর স্ট্যাটাস হতে গৃহীত https://www.facebook.com/onu.tareq/posts/10153085187250497)

মধ্যযুগ,তথাকথিত “বর্বরতা” এবং বাস্তবতা

মধ্যযুগ ও বর্বরতা-এই দুইটি শব্দকে সুশীল সমাজের অনেকেই সমার্থক বিবেচনা করে থাকেন। অমানুষিক ও নির্দয় কার্যকলাপকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলে বিশেষায়িত করার প্রবণতা মোটেও বিরল নয়। কারও নীতি-আদর্শ ও চিন্তাধারার নিন্দা করতেও এই বাগধারাটি হামেশাই ব্যবহূত হয়ে থাকে। স্বভাবতই কৌতূহলী মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে,ইতিহাসের কোন সময়টি আসলে মধ্যযুগ? সেই সময়ে কিইবা এমন ঘটেছিল,যার জন্য প্রাচীন ও প্রাগৈতিহাসিক এবং ঔপনিবেশিকতার কালপর্ব ছাপিয়ে মধ্যযুগের বর্বরতা অমোচনীয় হয়ে গিয়েছে,সভ্যতার ললাটে কলঙ্কচিহ্ন হয়ে রয়েছে! এক্ষণে এই বিষয়ে কিঞ্চিত্ আলোকপাত করা যেতে পারে বৈ কি।
ইতিহাসবিদগণ পাঁচ শত খ্রিষ্টাব্দ হইতে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত কালপর্বকে মধ্যযুগ বলে আখ্যায়িত করেন। এই সহস্রবর্ষের ইতিহাস বিশ্বময় ইসলাম ধর্মের প্রসার এবং মুসলমান শাসকদের বিজয়গাথায় পরিপূর্ণ। আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের অবসান ঘটে মধ্যযুগের ঊষাকাল ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহাম্মদের (সা.) রিসালতের মাধ্যমে। নির্জন হেরাগুহায় নবীর (সা.) নিকট আল্লাহুতায়ালা অবতীর্ণ করেন মহাগ্রন্থ আল কুরআন। মদীনায় রাষ্ট্রগঠন এবং মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে আরবের বর্বর যুগের। খোলাফায়ে রাশেদিনের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর খিলাফতের সময়ে সূচিত হয় ইসলামের বিজয় অভিযান। ইসলামের প্রেরণায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যে পুনর্জাগরণ ঘটে। ফিলিপ কে, হিট্টি লেখেন, ‘হাজার বছর পাশ্চাত্য অধীনতায় থাকার পর পুনরায় আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্য।’ পতন ঘটে রোম সাম্রাজ্যের। বাইজেনটাইন ও পারস্য সাম্রাজ্য মুসলিম খেলাফতের অধীনে চলে আসে।
মধ্যযুগের ইতিহাস এমন নয় যে, অবিমিশ্র সুখ ও সমৃদ্ধির। আবার এমনও নয় যে, বর্বরতা ও স্বেচ্ছাচারিতায় ইতিহাসের সকল কালপর্বকে এটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মানবিকতা ও বর্বরতা, সুশাসন ও স্বেচ্ছাচারিতা, উত্কর্ষ ও অনুত্কৃষ্টতা সব কালেই কমবেশি ছিল এবং আছে। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের বিকাশ ও বিজয়ের হাজার বছরকে পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদগণ বর্বরতার যুগ হিসাবে কেন বিশেষায়িত করতে চাইছেন তা খুব সহজেই অনুমেয়। অথচ এই মধ্যযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান,রসায়ন,শিল্প-সাহিত্য ও দার্শনিক চিন্তার বিপুল বিকাশ ঘটে।
ইউরোপে যখন একটা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না তখন আরব, ইরান, সিরিয়াসহ মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি শহরে গড়ে উঠে অসংখ্য বিজ্ঞানাগার, পাবলিক লাইব্রেরী, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়।মধ্যযুগের বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ (House of Wisdom) তো ছিল জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার প্রাণভোমরা। বিজ্ঞানের ব্যবহারিক দিক অর্থাৎ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি সর্বপ্রথম মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রবর্তন করেছিলেন, গ্রিক যুগে এটা কারও জানা ছিল না। মুসলমানদের আর একটি প্রধান কীর্তি হলো অবলুপ্ত প্রায় গ্রিক ও ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের আহরণ, অনুবাদ ও সংরক্ষণ। তা না হলে অনেক আগেই এ দুই মহাসভ্যতার বহু দানের চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকত না । ফলে মধ্যযুগেই ইসলামী সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন রেনেসাঁর জন্ম দেয় [রেনেসাঁ বলতেই আমাদের ইউরোসেন্ট্রিক মনোজগতে অবশ্য ইউরোপের রেনেসাঁর কথা মনে পড়ে যায়]! এই মধ্যযুগীয় রেনেসাঁর ফলেই জন্ম নেয় শত শত পণ্ডিত, দার্শনিক, বিজ্ঞানী যারা জ্ঞান -বিজ্ঞান-দর্শন এসবের বিকাশ ও আবিস্কার করে মানব সভ্যতার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অবদান রেখেছেন।
আল-খোয়ারিজমি (বীজগণিত ও এলগোরিদম এর জনক); জাবির ইবনে হাইয়ান (আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক); ইবনে সিনা (আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক, ফার্মেসি ও এরিস্টটলীয় ফিলোসপির একজন স্বনামধন্য পণ্ডিত-যার মেডিসিনের উপর বইগুলা ইউরোপেও ১৮ শতক পর্যন্ত ছিল পাঠ্যবই) , ওমর খৈয়াম, আল বিরুনি, ফারাবি, আরাবি, আল বাত্তানী,আল খাসিব , ইবনুল হাইছাম , আল রাজী , যারকালী, ইবনে বাজ্জা, ইবনে রুশদ, ইবনে খলদুন, এরা কোন যুগের বিজ্ঞানি, জ্ঞানী , তাত্ত্বিক? এরা যে রসায়ন, পদার্থ, চিকিৎসা বিজ্ঞান , উদ্ভিদ বিজ্ঞান, ফার্মেসি,গনিত,ব্যাকরণ, অলংকার শাস্ত্র, ভাষাতত্ত্ব, ভূগোল, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা সহ জ্ঞানের সব শাখায় নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য আবিস্কার করলেন তা কোন যুগ- মধ্যযুগের এই মুসলিম বিজ্ঞানীদের ও জ্ঞান তাত্ত্বিকদের এই রেনেসাঁ কি প্রগতিশীলতা নয়? ইউরোপীয় রেনেসাঁ তো মধ্যযুগের এই রেনেসাঁর কাছে সুস্পষ্টভাবে ঋণী ! কিন্তু ইউরোপীয় আধিপত্যবাদিরা এই ঋণ স্বীকার করতে রাজি না!
ইউরোপ তখন অন্ধকার যুগে ছিল বলেই পুরা মধ্যযুগকেই বর্বরতার আর অন্ধারের যুগ বলে হেজেমনিক প্রচার চালিয়ে তারা মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক অবদানকে নাকচ করে দিতে চায়। এটাকে বলা যায় সভ্যতা আর জ্ঞান বিজ্ঞানের ইতিহাসকে হাইজ্যাক করার পশ্চিমা বর্ণবাদী আচরণ! প্রগতিশীলতা মাত্রই ইউরোপীয় রেনেসাঁ না, ইসলামি রেনেসাঁর যুগকে বাদ দিয়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁ নিয়ে মেতে থাকলে তা ইউরোপীয় হেজিমনিক বয়ানের দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই না!
তাহলে মধ্যযুগের আলোকিত মুসলিম সভ্যতাকে অস্বীকার করে একে অন্ধকার যুগ বলে চালিয়ে দেয়ার মানে হচ্ছে ঐতিহাসিক শঠতা এবং তা সভ্যতা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দুর্বৃত্তায়নকে মেনে নেয়া যে দুর্বৃত্তায়ন মদিনা, বাগদাদ, দামেস্ক, খোরাসানকে বাদ দিয়ে আধুনিক ইউরোপের বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির চর্চাকেই কেবল রেনেসাঁ বলে চালিয়ে দেয়। এ হচ্ছে প্রাচ্য সম্পর্কে ইউরোপের তৈরি হেজিমনিক ডিসকোর্স যাকে বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাইদ নাম দিয়েছেন প্রাচ্যবাদ ( Orientalism)। এই ডিসকোর্স মধ্যযুগের প্রাচ্যের আলোকিত অধ্যায়কে চাপা দিয়ে তৈরি করে মিথ্যার বুনোনি মানে প্রাচ্য হচ্ছে গতিহীন, প্রগতিহীন, স্থবির, বর্বর সমাজের প্রতিভূ; আর পাশ্চাত্যই প্রগতিশীলতা, সভ্যতা, উন্নয়নের প্রতিভূ। প্রাচ্যকে তার গর্বের ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়ে, তার প্রেরণার ঐতিহ্য সম্পর্কে তাকে অন্ধকারে রেখে দিলে পশ্চিমের লাভটা কোথায়? পশ্চিমের লাভ হচ্ছে প্রাচ্য তার নিজস্ব চেতনা আর আত্মশক্তি হারিয়ে পশ্চিমকেই উন্নত সংস্কৃতি-সভ্যতা আর আদর্শের প্রতিভূ ভাববে, ফলে প্রাচ্যের মননে বাসা বাঁধবে এক মানসিক উপনিবেশ যে মনন উত্তর রেনেসাঁ (ইউরোপীয়) যুগে রাজনৈতিক, সামাজিক, মতাদর্শিক, বৈজ্ঞানিক এবং চিন্তাগতভাবে প্রাচ্যকে পশ্চিমের কাছে নির্ভরশীল করে তুলবে। সাইদের মতে এটি হচ্ছে পশ্চিমের প্রাচ্যকে পদানত করার এক আধিপত্যবাদী স্পৃহা।
আমরা যদি উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে মধ্যযুগের মূল্যায়ন করি, তাহলেও দেখতে পাওয়া যায় উৎকর্ষ অর্জনের অব্যাহত প্রয়াস। মধ্যযুগে আমাদের এই উপমহাদেশ কোনো অখণ্ড সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল না। পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত শাসন হীনবল হয়ে যেতে শুরু করে। এগার শতকের আগে পর্যন্ত এই উপমহাদেশে মুসলমান শাসকের আগমন ঘটেনি। ১১শ এবং ১২শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রাজ্যই মুসলমানদের দখলে চলে যায়। মুসলিম বিজয়ের পর উপমহাদেশে সামাজিক সম্পর্কের নূতন মেরুকরণ শুরু হয়। হিন্দু-মুসলমানের মেলবন্ধন রচিত হইতে শুরু করে এই সময়ে। বিদেশাগত মুসলমানরা যেমন এই অঞ্চলের সনাতন সংস্কৃতির অনেক কিছুই মেনে নেয়,তেমনই সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও বহিরাগত জীবন-সংস্কৃতির অনেক কিছু নিজেদের করে নেয়। গোটা মধ্যযুগ ধরে ভারতবর্ষে দেখা যায় শক্তিশালী গ্রামীণ সমাজ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল। শাসকগণ বহু জনহিতকর কাজ করেছেন। প্রজাপালনে তাদের বদান্যতা ছিল যথেষ্ট। সুলতানি আমলে উপমহাদেশে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্যের বিশেষ উত্কর্ষ সাধিত হয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এই সময়ে নবতর বিকাশের পথ খুঁজে পায়। অন্যদিকে এই মধ্যযুগের শেষভাগে এসে ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কৃত হইলে সাহিত্য-দর্শন এবং চিন্তা জগতে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। ঐতিহাসিক ম্যাগনাকাটা সনদের মাধ্যমে ব্রিটেনের রাজনীতির নূতন বিকাশ ঘটতে শুরু করে।
তারপরও এটি অসত্য নয় যে, মধ্যযুগে বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে রাজা এবং সামন্ত শ্রেণীর অত্যাচার-শোষণ অব্যাহত ছিল। আর, এই উপমহাদেশে বৈদিক যুগ হইতে চলে আসা ক্রীতদাস প্রথাও বহাল ছিল যথারীতি। ছিল সতীদাহ প্রথা। এইসব নৃশংসতা ও অমানুষিকতার কোনোটাই কিন্তু মধ্যযুগের সৃষ্ট নয়,সর্বব্যাপীও নয়। দেশ-কাল ও পাত্রের প্রভেদ ছিল। কাজেই কোনো একটি যুগকে বিশেষায়িত করার আগে ইতিহাসের নিবিড় পাঠ একান্ত প্রয়োজন।
কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকারঃএই লেখাটি মূলত ইত্তেফাকের ১৪ই মে,২০১৩ এর মঙ্গলবারের সম্পাদকীয় থেকে গৃহীত।সম্পাদকীয়টি মূল ভাব ঠিক রেখে কেবল সাধু রীতি থেকে চলিত রীতিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এর সাথে মুক্তব্লগ নামে সাইটের সাহায্য নেওয়া হয়েছে

বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৩

বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান কামিজ জনপ্রিয় হয় ক্যামনে?

প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের একটা সুবিধা আছে।অনেক রিপোর্ট নতুন করে লিখতে হয়না।প্রায় একই ধরনের লেখা ফি বছর কিছুটা এডিট করে চালিয়ে দেওয়া যায়।র‍্যাবের ক্রসফায়ারের গল্প যেমন সবসময়ই এক রকম,তেমনি ঈদ বাজারের গল্প ও প্রায় একই রকম।দেশে বড় কোন মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা না ঘটলে বাজারের চেহারা প্রায় একই থাকে।পত্রিকার শেষ পাতায় কোন শাড়ি দোকানের ছবি আর নিচে ক্রেতা বিক্রেতার প্রতিক্রিয়া,বাজারে নতুন কি ফ্যাশন এল তার বর্ণনা।ব্যবসা ভালো হোক মন্দ হোক বিক্রেতা মুখে হতাশা ফুটিয়ে বলেন, ‘বিক্রি বাট্টা গত বছরের তুলনায় কম’ আর ক্রেতা বলেন, ‘দামটা গত বছরের তুলনায় বেশি’! গত একযুগের ও বেশি সময়ে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর ঈদ বাজারে ভারতীয় সিরিয়ালের কিংবা বলিউডের কোন নায়িকার নামের জামা বেশ জনপ্রিয় থাকে এবং সেগুলো বেশ চড়া দামে বিক্রি হওয়ার খবর ও আমরা পত্রিকায় পড়ে থাকি।কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে এগুলো আসলে তেমন অসাধারণ কিছু নয় বরং নামের কারণেই এইসব জামার এত হু হু কাটতি।অর্থাৎ ইন্ডিয়ান নানা ছাইপাশ সিরিয়াল কিংবা মসলাদার মুভির এত প্রভাব এতটাই যে আমরা যেনতেন একটা জামাও কেবল নামের কারণে অনেক দাম দিয়ে কিনতে রাজি!তবে আবার একদম নতুন কিছু যে থাকেনা সেরকমটা কিন্তু না।সেটা একেবারেই যৎসামান্য।পুরনো বোতলে নতুন মদ কিংবা ব্যাপারটা ভাত সরাসরি না খেয়ে ঘাড়ের পিছন দিয়ে খাওয়ার মত।
সে যা-ই হোক না কেন,নানা ধরনের দেশী ফ্যাশন হাউজ থাকার পরেও যখন এইসব ইন্ডিয়ান কাপড় চোপড়ের বেশ চাহিদা থাকে,তখন আপনি কোনভাবেই এটাকে শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখতে পারেন না।শুধু হুজুগের উপর ভিত্তি করে ঈদ বাজারের মত বিশাল একটা অংকের বাজার বিদেশীদের দখলে চলে যাবে,তবে সেটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তার অবকাশ আছে বৈ কি।নারীদের সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে থাকাটা যদিও বিরাট কারণ তবে শুধু ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ না।আমার নিজের একটা ধারণা যে ঘরের শত্রু বিভীষণের মত এইখানটায় আমাদের পিছন থেকে ছুরি মারছে আমাদের দেশী মিডিয়াই।ব্যাপারটা তেমন কিছু না।একটু ভালোভাবে দেখলেই চলে।আলোচনার সুবিধার্থে একজন গড়পড়তা মধ্যবিত্ত বাংলাদেশী নারীর কথাই বিবেচনা করা যাক।হতে পারেন তিনি একজন ছাত্রী,পেশাজীবী কিংবা কেবলই আটপৌরে গৃহিণী।তিনি হয়তো দিনের উল্লেখযোগ্য একটা সময় ব্যয় করেন ইন্ডিয়ান টিভি সিরিয়াল দেখার পিছনে। নারীদের যেহেতু সাজগোজ কিংবা অলঙ্কারের প্রতি স্বভাবজাত একটা ঝোঁক থাকে,তাই ক্রমাগত।সিরিয়াল দেখতে দেখতে ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের চরিত্রগুলোর জাঁকালো সাজগোজ এইসব নারীদের মনের মধ্যে অজান্তেই কিংবা ইচ্ছাকৃত ভাবেই একটা প্রভাব ফেলে,চাহিদা তৈরি করে।আমরা যেহেতু মানসিকভাবে নানা ঔপনিবেশিকতার দাসত্ব ধারণ করি তাই ইন্ডিয়ান কিংবা অন্যসব প্রভুদের যে কোন বর্জ্য ও আমাদের কাছে বেশ ঝলমলে,আবেদনময়ী আর আকর্ষণীয়।যার কারণে প্রিন্স উইলিয়াম কিংবা ঐশ্বরিয়ার অনাগত সন্তান আমাদের উদ্বিগ্ন করে কিংবা টালিউডের কোয়েল মল্লিকের বিয়েও আমাদের কপালের ঘাম ঝরায়।এখন যেহেতু ঈদের মৌসুম আমাদের আলোচিতা হয়তো ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের পাশাপাশি দেশী বাজারের ট্রেন্ড জানার জন্য বাংলাদেশী চ্যানেলগুলোর লাইফস্টাইল শো গুলোতে চোখ রাখেন।সাধারণত এইসব শোতে পপুলার ট্রেন্ডই তুলে ধরা হয়।ব্যবসায়ীরা বেশ ভালোভাবেই জানেন বাংলাদেশী নারীদের মনে ইন্ডিয়ান ব্যাপারস্যাপারের প্রতি ‘অন্য রকম’ একটা ভালোলাগা আছে।ফলে তারা নানা নামে এইসব সিরিয়ালের পোশাক আশাকই আনেন এবং লাইফস্টাইল শোগুলোতে সেটাই দেখানো হয়।সেই সাথে দেখানো হয় একজন নারী কিভাবে নিজেকে কমনীয়-মোহনীয়-আকর্ষণীয় করে তুলবেন।রূপচর্চা আর সাজগোজের মাধ্যমে নিজেকে কিভাবে “নতুন উচ্চতায়” নিয়ে যাবেন তার আউট লাইন দেওয়া হয়।যেহেতু তিনি একজন মধ্যবিত্ত,তিনি একটা পত্রিকা রাখার সামর্থ্য রাখেন এবং অন্য কোনদিন না হলেও অন্তত মঙ্গলবারে রাখেন। কারণ দেশের অধিকাংশ পত্রিকাই এইদিন লাইফস্টাইল ট্যাবলয়েড ছাপায়।ধরে নিচ্ছি মধ্যবিত্ত বাংলাদেশী নারী দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলোর ‘নকশা’র উপর চোখ রাখেন।যদি পত্রিকা না রাখেন অন্তত মাসিক লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাস,চারবেলা চারদিক অথবা আইস টুডে ম্যাগাজিন পড়ে নিজেকে হাল ফ্যাশানের সাথে আপডেটেড রাখেন।এদের সবারই ঈদ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন থাকে।‘নকশা’ তো পুরো রোজা জুড়েই এক্সট্রা পেজ ছাপিয়ে অন্য সব লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনকে ছাপিয়ে যায়।চার সপ্তাহের এই আয়োজনে কেবলই থাকে সকালে কি পড়বেন,বিকালে-সন্ধ্যায় কি পড়বেন কিংবা নিজেকে কিভাবে ঈদের শত ঝামেলার মধ্যেও সজীব ও প্রাণবন্ত রাখবেন।ঈদের আগে কিভাবে হাত-পা-চুল-রুপের পরিচর্যা করবেন।কোন জামার সাথে কি পড়বেন সেটা নিয়ে থাকে বিস্তর গবেষণা।এই গোটা ব্যাপারটা খুব সাধারণ কোন খরচ মনে হলে ভুল করবেন।সব হিসেব একত্র করলে অঙ্কটা দেখলে আপনার পিলে চমকে উঠতে পারে।এর সাথে যুক্ত হয় পাশের বাসার ভাবী,বান্ধবী কিংবা কলিগের কানকথা কিংবা প্রতিযোগিতা!এইসব কিছু মিলিয়ে সেই মধ্যবিত্ত নারী সিদ্ধান্ত নেন এবারের ঈদে উনারও চাই ‘সানি লিওন কামিজ’ কিংবা ‘আশিকি টুঁ থ্রিপিস’!দাম বেশি পড়লেও ক্ষতি নেই,শখের তোলা আশি টাকা!কাপড় চোপড়ের শো ডাউনের ঈদ তো বছরে একবারই আসে।
লেখার এতটুকু পড়েই আপনি যদি ‘তবে রে কালিয়া’ বলে লেখকের দিকে তেড়ে আসেন,তবে নিজের পিঠের চামড়া বাঁচানোর জন্যই লেখককে আরও কিছু ব্যাপার সামনে আনতে হয়।আমি সাংবাদিকতার ছাত্র নই।তবে টুকটাক পড়াপড়ির কারণে বুঝতে পারি আমদের চিন্তা-ভাবনা-ধ্যান-ধারণার উপর মিডিয়ার প্রভাব অপরিসীম।বিজ্ঞাপনদাতাদের মাধ্যমে আদিষ্ট হয়ে মিডিয়া প্রতিনিয়ত সেইসব পণ্যকেই বারবার এমনভাবে দেখাতে থাকে যে আপনার একটা সময় মনে হবে যে এই জিনিসটা আমার লাগবেই।মিডিয়ার এভাবে বারবার দেখানোর ফলে যেখানে গণহত্যা পর্যন্ত ‘জায়েজ’ হয়ে যায় সেখানে ফ্যাশন তো ধুতচ্ছাই পর্যায়ে পরে।আমি স্মরণ করি আমার বেশ পছন্দের একজন মনিষী ম্যালকম এক্সের সেই বিখ্যাত বাণী,
“If you’re not careful, the newspapers will have you hating the people who are being oppressed, and loving the people who are doing the oppressing.”
এখন স্বভাবতই একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে যে মিডিয়া তো সেটাই দেখাচ্ছে যেটা কিনা আমরা পছন্দ করি।ব্যাপারটা অনেকাংশে সত্য হলেও পুরোপুরি নয়।এটা কেবলই অজুহাত।এইখানটায় আবার কৃতজ্ঞচিত্তে ধার করি সচলায়তনের মাহবুব আজাদ ওরফে হিমুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা,
“পত্রিকার কাজ শুধু দর্শক পাঠকের চাহিদা যোগানো নয়, জনরুচি নির্মাণ করাও পত্রিকার কাজ।জনরুচিতে দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় অনুষ্ঠান-সিনেমা-তারকাদের গ্রহণযোগ্যতা নির্মাণে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর ভূমিকা অপরিসীম”
সব পত্রিকার ফিচার এডিটররা মিলে যদি ঠিক করেন যে তারা আর বলিউডকে কিংবা ইন্ডিয়ান সিরিয়াল-রিয়েলিটি শোকে প্রোমোট করবেন না,তাহলে হয়তো আমরা অনেকভাবে লাভবান হবো।আমাদের ঈদ পোশাকের বাজার হয়তো ইন্ডিয়ার দখলে যাবে না,আমাদের চোখ কেবল ইন্ডিয়ান পোশাকের দিকে যাবে না অথবা আমাদের টিভি রিমোট কেবল ইন্ডিয়ান মুভি সিরিয়াল খুঁজে বেড়াবে না। কিন্তু ভ্রাতা বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?
পুনশ্চঃ১. একটা অগ্রিম দুঃসংবাদ দিয়ে আজকের মত বিদায় নিই।ঈদের আগে আগেই কিংবা ঈদের পরে পত্রিকা চালু হওয়ার পরে একটা খবর একটু খুঁজে দেখবেন ‘ ঈদের পোশাক না পেয়ে আত্মহত্যা’। কখনো বাবা মার সামর্থ্য থাকেনা সন্তানের আকাশ ছোঁয়া সামর্থ্য পূরণের। মনের অজান্তে এইভাবে উচ্চাভিলাষী চাহিদার বীজ যারা বপন করে দিচ্ছে তাদের জন্য কতটা ঘৃণা বরাদ্দ থাকা উচিত?
২.ভারতীয়রা আমাদের কিভাবে দেখে তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে এই লেখা থেকে
ভারতীয়দের মনোভাবটি দেখেছি, তারা কথায় কথায় মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যে সমর্থন ও সাহায্য করেছিল তা মনে করিয়ে দেয়। তারা মুখে ভাই ভাই বললেও আমাদেরকে নীচু জাতি হিসেবে দেখে এবং বাংলাদেশ নিয়ে অহরহ তামাশা করে। তারা শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেট লিডার বললেও বোঝানোর চেষ্টা করে ভারতের সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশ নামে কোন ভুখণ্ডের জন্ম হতো না। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ টিকে আছে ভারতের সাহায্য নিয়ে। এমনকি ভারতীয় বাঙ্গালীদের বলতে শুনেছি, বাংলাদেশের বাংলা আসলে বাংলা ভাষার ব্যাঙ্গাত্বক রুপ। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশীরা সঠিক ভাবে বাংলা লিখতে বা পড়তে জানেনা।
আমাদের সাহিত্যিকরা তাদের কাছে কোন সাহিত্যিকই নয়, এমনকি ছ্যা.. ছ্যা.. শব্দ উচ্চারণ করে তারা বাংলাদেশের বাংলাকে অপমান করে থাকে । অথচ বাংলাদেশের প্রাপ্য সব জায়গায় তারা ভাগ বসায়, সে গ্যাসই বা নদীর পানিই হোক অথবা বাংলাদেশ বর্ডারের শেষ সীমানাই হোক… আর যদি তা বাংলাদেশের জন্য তৈরি রেডিও, টিভি হয় তাহলেতো কথাই নেই। এক্ষেত্রে তারা বলবে বাংলাদেশে কোন সাংবাদিকই নেই এবং বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মান খুব নীচু। বিদেশি বসের ভাষাগত অজ্ঞানতার সুবিধা নেবে আর বসের পিছনে চাটুকারিতা, এমন কি প্রয়োজনে সব কিছু দিয়ে বসকে খুশি করে পদবী দখল করার খেলায় তারা মত্ত্ব। এই খেলা বাংলাদেশীদের বুঝতে অনেক সময় লাগে, আরে তাতেই কেল্লা ফতে।
জার্মান সরকার, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জয়ের পরে তখনকার বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অনুরোধে যে বাংলা ডিপার্টমেন্টটি উপহার স্বরূপ বাংলাদেশকে দেওয়া হয়োছিলো; তার বর্তমান বিভাগীয় প্রধান একজন ভারতীয় বাঙ্গালী। তার পাসপোর্ট ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেয় বর্তমান বিভাগীয় প্রধান। এর কারন হলো, ডয়েচে ভেলের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি বিভাগের প্রধান হতে হবে সেই দেশের একজন নাগরিককে। অর্থ্যাৎ চাইনিজ বিভাগের প্রধান হবে একজন চাইনিজ। এ ক্ষেত্রে নিজেকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিলেই এই সুবিধাটি গ্রহণ করা যায়। যদিও ডয়েচে ভেলেতে ভারতীয়দের জন্য একটি আলাদা বিভাগ রয়েছে। সেখানে কিন্তু কোন বাংলাদেশি বিভাগীয় প্রধান নয়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাপ্য সম্পত্তি তারা দেশে বিদেশে সব জায়গায় নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে ভোগ ও হজম করে চলছে। এমনকি মুসলিম ধর্ম পরিচয় নিয়েও তারা বিভিন্নভাবে অশ্রদ্ধার কথা বলে।

এই লেখার শিরোনাম খুঁজে পাচ্ছি না

১.কাকতালীয়ভাবে হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমার প্রিয় গল্প-উপন্যাস দুইটার নামই ‘রূপা’!দুইটা লেখা পড়েই আমি এত চমৎকৃত হয়েছিলাম যে বলে বুঝানো যাবে না।উথাল পাতাল প্রেমের গল্প।ভালো না লেগে উপায় নেই।পড়ে এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে আহ!এমন প্রেম ও বুঝি হয়!মিসির আলী বেশ ভালো লাগলেও অন্য অনেকের মত ওইভাবে টানেনি হিমু।কিছু হিউমার ছাড়া তেমন কিছু একটা মনে হয়নি সেগুলো।হুমায়ূন আহমেদের গল্প উপন্যাসের চাইতেও আমার ভালো লেগেছিল তাঁর আত্মকথাগুলো(বলপয়েন্ট,কাঠপেন্সিল,এই আমি,আমার ছেলেবেলা,হোটেল গ্রেভার ইন,মে ফ্লাওয়ার ইত্যাদি)।কি অসাধারণ সব বর্ণনা!পড়লেই মন ভরে যায়।’নিশিকাব্য’ নামে একটা গল্প সংকলন পড়েছিলাম।মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই বইয়ের প্রতিটা গল্পই রাতের পটভূমিতে বর্ণনা করা।একেকটা গল্পের চাইতে আরেকটা গল্পের স্বাদই অন্য রকম।আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের আরেক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল তাঁর বইগুলোর উৎসর্গপত্র।এমনিতে আমি শক্তমনা কাঠ খোট্টা টাইপের মানুষ।খুব কাছের কারো কষ্ট বেদনাও আমাকে কখনো কখনো ছোঁয় না।কিন্তু কেন জানি ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এর শেষ কয়েকটা লাইন পড়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছিল।আমার পড়া সেরা বইয়ের একেবারে প্রথম তিনটার এইটা একটা।তবে আমার কাছে মনে হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ কেন জানি শেষের বছরগুলোতে তাঁর লেখার খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন।মাসখানেক আগে তাঁর শেষকিছু বই একটানা পড়ে গিয়েছিলাম।মেজাজ খিঁচড়ে যাওয়ার দশা।হয়তো বইয়ের উপর হুমায়ূন আহমেদের নাম লেখা না থাকলে ঐসব বই কেউ পড়তেন কিনা আমি ঘোর সন্দিহান।এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম যে হয়তো প্রকাশকদের মাত্রাতিরিক্ত চাপ তাঁকে ঐসব ‘ছাইপাশ’ লিখতে বাধ্য করেছিল।হুমায়ূন আহমেদকে বেশ চমৎকার একটা উপাধি দিয়েছিলেন আলী মাহমেদ শুভ ভাই।“ড্রাগ ডিলার”!আসলেই তাই।আমাদের মাথায় নেশা চাপিয়ে দিয়ে চলে গেছেন।তাঁর লেখা হয়তো একটা গণ্ডির বা ফ্রেমের মধ্যেই ঘুরপাক খেত।তারপরেও কি একটা যেন ছিল যা তাঁর প্রতি আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি।এটা তো নেশাই!
২.হুমায়ূন আহমেদের ছায়া এত বিশাল যে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে চাপা পড়ে যায় বাংলা বইয়ের জগতের আরেক কিংবদন্তীর জন্মদিন!কেউ যদি এই মানুষটাকে বাদ দিয়ে বাংলা প্রকাশনা কিংবা সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে চায় তবে তাকে গণ্ডমূর্খর চাইতে বেশি কিছু বলা যাবে না।”কাজীদা” ওরফে কাজী আনোয়ার হোসেন।তাঁকে বর্ণনা করা আমার কম্ম না।শুধুই একটা ধন্যবাদ জানাতে চাই এই কারণে যে বিশ্বসাহিত্যকে একদম সস্তার চাইতেও সস্তা করে আমাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন।এইটা যে কত বিশাল একটা কাজ তা সেবা প্রকাশনী চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে অনেকেই বুঝতেই পারবেনা।শুধু কাগজ-কালির দাম দিয়ে আর লেখকের নিরবিচ্ছিন্ন রয়ালিটি দিয়ে আজ চল্লিশ বছরের ও বেশি সময় যাবত প্রকাশনা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। রহস্যপত্রিকার মত ভিন্ন ঘরানার একটা কাগজ তেমন কোন বিজ্ঞাপন ছাড়া চালিয়ে যাচ্ছেন।হাতের নাগালে বইয়ের দাম রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার হিম্মত কেবল তিনিই দেখাতে পারেন।প্রচারবিমুখ এই কীর্তিমানকে দূর থেকে দাঁড়িয়ে সালাম জানানো ছাড়া এই অধম কি-ই বা করতে পারি?শুভ জন্মদিন প্রিয় কাজীদা
সংযুক্তিঃ
প্রথম আলোর মুখোমুখি
কাজী আনোয়ার হোসেন
পাঠকের কাজীদা
কাজী আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের পাঠককে রহস্যসাহিত্যমুখী করেছেন। পাঠকের হাতে বাংলা ভাষায় তুলে দিয়েছেন নানা দেশের নানা ভাষার রহস্য ও রোমাঞ্চকাহিনী। ‘মাসুদ রানা’ তাঁর জনপ্রিয়তম সিরিজ। পিছিয়ে ছিল না ‘কুয়াশা’ও। ১৯৬৪ সালে সেগুনবাগিচার এক ছোট ছাপাখানা থেকে সেবা প্রকাশনীর যাত্রা। এখন এর গ্রন্থতালিকা ঈর্ষণীয়। কত ভালোবাসা-নিন্দা, কত সাফল্য-ব্যর্থতা−সব নিয়ে কথা বলেছেন পাঠকের কাজীদা। তাঁর ৭২তম জন্নবার্ষিকী উপলক্ষে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আসজাদুল কিবরিয়া
আসজাদুল কিবরিয়া: সম্পুর্ণ মৌলিক কাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল আপনার মাসুদ রানা সিরিজ। বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দাকাহিনি বা স্পাই থ্রিলার তখন সম্পুর্ণ অজ্ঞাত একটি শাখা। এ রকম একটি শাখায় জীবনের প্রথম কাজটি কীভাবে করলেন? লেখার প্রক্রিয়াটি একটু বলবেন?
কাজী আনোয়ার হোসেন: কুয়াশা লেখা শুরু করেছি। কয়েকটি বইও বেরিয়েছে। এ সময় মাহবুব আমিনের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। তিনি বইগুলো পড়ে ইয়ান ফ্লেমিংয়ের ডক্টর নো বইটি আমাকে দেন। ওটা পড়ার পর বিস্িনত ও লজ্জিত হয়েছিলাম। রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যে বাঙালি লেখকেরা যে কতটা পিছিয়ে আছে, বুঝতে পারলাম। ঠিক করলাম, বাংলাতে ওই মানের থ্রিলার লিখব। শুরু হলো বিভিন্ন বিদেশি বই পড়া। কাহিনী সাজাতে মোটরসাইকেলে করে ঘুরে এলাম চট্টগ্রাম, কাপ্তাই ও রাঙামাটি। সেটা ১৯৬৫ সালের শেষদিকের কথা। এরপর কাগজ-কলম নিয়ে বসলাম। কিন্তু লিখতে গিয়ে টের পেলাম, ভাষা নেই। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র আমি। সাহিত্যের ভাষা আসে। এ-ভাষায় থ্রিল-অ্যাকশনের দৃশ্য ছবির মতো ফুটিয়ে তোলা বড়ই মুশকিল। তাই লিখছি, কাটছি, আবার লিখছি, পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলছি, আবার লিখছি। এ ধরনের লেখা বাংলা সাহিত্যে ছিল না। ভাষা ও বিষয় কোনোটিই নয়। সে জন্যই চেষ্টা করতে হলো। চেষ্টা-চর্চায় তৈরি হলো ভাষা। সেবার ভাষা। এর মধ্যে কিছুটা রিপোর্টিং স্টাইল আছে। মানে, সহজভাবে বলার চেষ্টা, তার চেয়ে বেশি দৃশ্যপট পাঠকের চোখের সামনে স্পষ্ট ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা।
এভাবে চেষ্টা ও পরিশ্রম করে সাত মাস ধরে লিখলাম মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ধ্বংস-পাহাড়। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বাজারে এল বইটি। প্রশংসা-সমালোচনা, নিন্দা-অভিনন্দন−সবই জুটল। এরপর সিরিজের দ্বিতীয় বই ভারতনাট্যম প্রকাশিত হলো। এটা লিখতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগেছিল। বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে লিখছিলাম বইগুলো। পরবর্তী সময়ে মউত কা টিলা নামে ধ্বংস-পাহাড়ের উর্দু সংস্করণও হয়েছিল।
আ. কিবরিয়া: আজও বাংলা মৌলিক থ্রিলার সাহিত্যে ধ্বংস-পাহাড় ও ভারতনাট্যমকে ছাড়াতে পারেনি কোনো বই। তার পর থেকেই আপনি অ্যাডাপটেশন শুরু করলেন। মৌলিক থ্রিলার লেখার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আর কেন ও পথ মাড়ালেন না? গত ৪৪ বছরে আর কখনোই কি ইচ্ছে হয়নি নিজের মতো করে, মৌলিক একটি থ্রিলার বা রানা লেখার?
কা. আ. হোসেন: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘এই যে আপনি অ্যাডাপটেশন শুরু করলেন, আর কখনও মৌলিক লিখতে পারবেন না।’ এটাও বলেছিলেন যে ভালো লেখা আমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু আমি জানতাম যে আমি পারব। আর ইচ্ছে তো অবশ্যই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়েছে সময়স্বল্পতা।
আসলে ধ্বংস-পাহাড় ও ভারতনাট্যম প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকদের কাছ থেকে চিঠির পর চিঠি আসতে থাকল−আরও দ্রুত বই চাই। আর আমি তো বই লিখে ও প্রকাশ করে জীবিকা নির্বাহের কাজটি শুরু করেছি। একজন লোক একাধারে লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক ও ব্যবসায়ী। তাই নিয়মিত প্রকাশনা নিশ্চিত করতে বিদেশি কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে মাসুদ রানা লেখা শুরু। আমি কিন্তু এখানে কোনো রাখঢাক করিনি। তাই আজও বইয়ের গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা হয় ‘বিদেশি কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে’। রানার কাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, রবার্ট লুডলাম, উইলবার স্িনথ, ক্লাইভ কাসলার, হ্যামন্ড ইনস, ডেসমন্ড ব্যাগলি, ইয়ান ফ্লেমিংসহ অসংখ্য লেখকের বই থেকে। কিন্তু এই অ্যাডাপটেশন এতটাই নিজেদের মতো সাজিয়ে করা হয়েছে যে কোত্থেকে কাহিনীগুলো এল তা আর ভাবতে ইচ্ছে করে না। যখন খুশি মূল থেকে সরে গিয়েছি বলেই গিলটি মিয়া, ইদু মিয়া, সোহেল, অনীতা গিলবার্টের মতো চরিত্রগুলোর সৃষ্টি হতে পেরেছে।
আবার, আমার মনে হয়েছে, রানার একটা প্রতিপক্ষ দরকার, ঈর্ষা করার মতো কাউকে দরকার এবং সেটা মেয়ে হলে ভালো হয়। সেই থেকে সোহানার আগমন। মেজর জেনারেল রাহাত খান সোহানাকে অসম্ভব স্েমহ করেন, ভালোবাসেন। রানা ভেতরে ভেতরে ঈর্ষান্বিত হয়ে ভাবে, ‘ঠিক আছে, ও-ই থাক। আমি চলেই যাব।’ আবার সোহানা মনে করে, রানাকেই বিসিআই চিফ বেশি পছন্দ করেন। ফলে দুজনের মধ্যে একটা হিংসাহিংসি কাজ করে। পাঠকদের কারও কারও মধ্যে এ ধারণাও হলো যে সোহানা রানার বউ হতে চলেছে। তাই ‘সোহানা ভাবি’ সম্বোধন করে অনেক চিঠিপত্রও এসেছে। দাবি এসেছে, পয়লা বৈশাখে রমনার বটমূলে রানা সোহানাকে নিয়ে যাক। আসলে ওরা দুজন তো সহকর্মী। প্রেমিকা-বান্ধবীও ছিল, কিন্তু যেহেতু দুজনই এসপিওনাজে আছে, সেহেতু ঘর বাঁধতে পারে না।
কখনো কখনো মাসুদ রানার মনটা হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে যায়। ওর মনে পড়ে, কবে একটা কবিতা পড়েছিলাম, ‘কাছে এল পূজার ছুটি/রোদ্দুরে লেগেছে চাঁপাফুলের রং।’ সমুদ্রের ধারে অস্তগামী সুর্য দেখে প্রকৃতির বিশালত্বের কাছে নিজেকে তার খুবই ছোট মনে হয়। জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পায় না। এ ধরনের চিন্তার সঙ্গে বাঙালি যুবকেরই মিল পাওয়া যাবে। জেমস বন্ড বা অন্য কোনো বিদেশি থ্রিলারে এসব থাকে না।
আ. কিবরিয়া: অ্যাডাপটেশনের এই ধারা কি শেষ পর্যন্ত আমাদের রহস্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছে? ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খারাপ হোক ভালো হোক, রহস্যসাহিত্যের একটা নিজস্ব ধারা চালু হয়েছে। কারও কাছ থেকে ধার না করেই তাঁরা নিজেদের মতো করে লেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, ৪৪ বছর ধরে রহস্যসাহিত্যের চর্চা করার পরও বাংলাদেশে মৌলিক রহস্যসাহিত্যের কোনো বিকাশ হয়নি বললেই চলে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
কা. আ. হোসেন: বাংলাদেশে মৌলিক রহস্যসাহিত্যের বিকাশ না হওয়ার প্রধান কারণ, আমি বলব, আমাদের অভিজ্ঞতার অভাব; বিশেষ করে স্পাই থ্রিলারের ক্ষেত্রে। আমাদের তো এসপিওনাজের তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। ইয়ান ফ্লেমিং নৌবাহিনীর ইন্টেলিজেন্সে ছিলেন। অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিনও ছিলেন গুপ্তচর, যুদ্ধেও গেছেন। সমারসেট মমও গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। এ রকম আরও অনেক বিদেশি লেখক ছিলেন ও আছেন, যাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিস্তর পড়াশোনা আছে। আমাদের তা কোথায়?
আর রহস্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার কথা বলছ? আমি তো মনে করি, পাঠক কিছুটা সমৃদ্ধ হয়েছে অ্যাডাপটেশনের ফলেই। একটা জমজমাট কাহিনিকে যতখানি সম্ভব বাঙালি পাঠকের উপযোগী করে পরিবেশন করা হচ্ছে। অসংখ্য অজানা তথ্য জানতে পারছে পাঠক। তার পরও অবশ্য কিছু ভুলত্রুটি থেকে যায়। একবার এক সেনা কর্মকর্তা চিঠি লিখে জানালেন, মাসুদ রানা সিরিজের কোনও এক বইতে বোমা বিস্কোরণের পদ্ধতির যে বর্ণনা দিয়েছি তা ভুল। তিনি সঠিক পদ্ধতিটি বিস্তারিত লিখে পাঠালেন।
পশ্চিমবঙ্গে মৌলিক রহস্যসাহিত্য লেখার চেষ্টা হচ্ছে ঠিকই, তবে তার মান যে খুব উঁচু, তা আমি বলব না। অল্প কিছু নিঃসন্দেহে ভাল, কিন্তু বেশিরভাগই ছেলেভোলানো, জুজুর ভয় দেখানো সাদামাটা কাহিনি। তাঁরা মৌলিকত্বের দাবি করলেও, জেনে রাখো, ওখানেও প্রচুর অ্যাডাপটেশন হয়েছে ও হচ্ছে। শশধর দত্তের দস্যু মোহন তো দ্য সেইণ্ট-এর ছায়া অবলম্বনে। আর্থার কোনান ডয়েলের কাহিনি এদিক ওদিক করে নিয়ে নীহাররঞ্জন গুপ্ত কত কীই না লিখেছেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ঝিন্দের বন্দী লিখেছেন প্রিজনার অব জেন্ডা অবলম্বনে। কিন্তু কেউ স্বীকার করেননি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মানদীর মাঝি লেখার আগে পদ্মাপারের জেলেদের সঙ্গে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। আমরা কয়জন পারব ও রকম পরিশ্রম ও একাগ্রতায় কাজ করতে? এভাবে বাণিজ্যিক লেখা সম্ভব নয়।
আ. কিবরিয়া: আমরা জানি, একাধিক গোস্ট লেখক মাসুদ রানা লেখেন। এঁদের নাম বলবেন কি? বই নির্বাচন থেকে পুরো লেখার প্রক্রিয়াটি একটু বলুন।
কা. আ. হোসেন: আড়ালে থেকে মাসুদ রানা ও কুয়াশা সিরিজের বই যাঁরা লিখেছেন তাঁদের অনেককেই তুমি চেনো। বিভিন্ন সময় যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা কমবেশি প্রাপ্তিযোগের প্রত্যাশাতেই লিখেছেন। তাঁরা সবাই বড় লেখক। অন্যের নামে লিখলেও নিজের নামে বই লেখার ক্ষমতা যে তাঁদের নেই, এমন তো নয়। তাঁদের নাম বলে দিয়ে তাঁদের প্রতি অবিচার করা কি ঠিক হবে?
যিনি রানার কাহিনি লিখতে আগ্রহী, তিনি প্রথমে কোনো একটি ইংরেজি বইয়ের কাহিনি সংক্ষেপ জমা দেন। কাহিনি পছন্দ হলে আলোচনার মাধ্যমে তাঁকে বুঝিয়ে দিই কীভাবে কাহিনি এগোবে, রানা কীভাবে আসবে, কী করবে ও কী করবে না। মাসখানেক পরিশ্রমের পর তাঁর লেখা শেষ হয়, তখন পান্ডুলিপিটি আমি পড়ি। যেসব জায়গায় সংশোধন ও পরিবর্তনের প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে টীকাসহ লেখককে ফেরত দিই। তিনি আবার ঠিকঠাক করে দিলে চুড়ান্তভাবে আর একবার দেখি ও সম্পাদনা করি। এসবে আমার লেগে যায় পনেরো দিনের মতো। তার পরই রানা বই আকারে ছাপা হয়।
আ. কিবরিয়া: কোনো লেখকের পান্ডুলিপিই সম্পাদনা ছাড়া সেবা প্রকাশনী থেকে বই হিসেবে প্রকাশিত হয় না। এ জন্য একটি সম্পাদকমন্ডলীও আছে। সম্পাদনার বিষয়টি কেন গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলেন?
কা. আ. হোসেন: সম্পাদনার প্রয়োজন আছে। সবার লেখাতেই ভুল-ভ্রান্তি থাকে, আমারটাতেও। একজনের লেখা আরেকজন পড়লে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি শুধরে যায়। কিন্তু আমার পক্ষে একা সব পান্ডুলিপি দেখা ও সংশোধন করা একটা পর্যায়ে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ ভাষাসহ বইয়ের সার্বিক একটা মান ধরে রাখা প্রয়োজন। সে জন্যই সম্পাদক খুঁজতে হলো। তবে এখন আর সেভাবে সম্পাদনা হচ্ছে না। যে পারিশ্রমিক দিতে পারি, তাতে কেউ সম্পাদনা করতে আগ্রহী নন। আবার কাজটা সম্পাদনানির্ভর থাকলে লেখকও যথেষ্ট যত্নবান হন না। কেউ কেউ আবার অন্যের সম্পাদনায় সন্তুষ্টও হতে পারেন না। তাই এখন সেবায় রানা ও তিন গোয়েন্দা ছাড়া অন্য লেখা যিনি লিখছেন, তাঁকে যথেষ্ট শ্রম দিয়ে নির্ভুলভাবে লেখার চেষ্টা করতে হচ্ছে। আমি চোখ বুলিয়ে দিই। তবে বই প্রকাশ হওয়ার পর পাঠকের প্রতিক্রিয়াই লেখকের পরবর্তী বই ছাপা হবে কি হবে না, তা নির্ধারণ করে। একসময় যাঁরা পান্ডুলিপি সম্পাদনা করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন কবি আবু কায়সার, কবি সাযযাদ কাদির, রওশন জামিল, আসাদুজ্জামান, সেলিনা সুলতানা, ইফতেখার আমিন, কাজী শাহনুর হোসেন প্রমুখ।
আ. কিবরিয়া: মাসুদ রানা সিরিজের সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর নাম বলবেন?
কা. আ. হোসেন: শত্রু ভয়ংকর, বিস্নরণ, মুক্ত বিহঙ্গ, আই লাভ ইউ, ম্যান ও অগ্নিপুরুষ।
আ. কিবরিয়া: মাসুদ রানার মাধ্যমে আপনি কিছুটা খোলামেলা যৌনতা নিয়ে এলেন। রক্ষণশীল সমাজে এটা তো অনেক বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। সমালোচনা সামলেছেন কীভাবে?
কা. আ. হোসেন: কাহিনিতে চাটনি বা বাড়তি মজা হিসেবেই মাসুদ রানায় যৌনতা এসেছিল। এ নিয়ে চারদিক থেকে সবাই যেভাবে মার মার করে উঠেছিল তাতে মনে হতে পারে, বাংলা সাহিত্যে আগে কখনো যৌনতা ছিল না। যাঁরা নিজেদের বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক ও অভিভাবক মনে করতেন, তাঁদের ভেতর থেকেই প্রতিবাদ-সমালোচনা বেশি এসেছিল। অথচ সুলেখক সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখায় যৌনতার ছড়াছড়ি ছিল। আমি যে ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ উল্লেখ করে দিয়েছি, সেটাও আমার দোষ হলো। উল্টো বলা হলো, এ জন্যই ছোটরা আরও বেশি পড়ে। সেই নিষিদ্ধ আপেলের প্রতি স্বভাবজাত আকর্ষণ!
মাসুদ রানার তৃতীয় বই স্বর্ণমৃগ প্রকাশিত হওয়ার পর সচিত্র সন্ধানী পত্রিকায় তীব্র সমালোচনা বেরোয়। তাতে লেখা হলো, কলম কেড়ে নিয়ে আমার হাতে আগুনের সেঁকা দেওয়া ও পল্টন ময়দানে বেঁধে জনসমক্ষে আমাকে চাবুক মারা দরকার। আমি তখন সচিত্র সন্ধানীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করলাম। জিততে পারিনি অবশ্য। তারা তখন প্রভাবশালী বন্ধু-বান্ধবের সহায়তায় আমার বইটিকেই সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়ে দিয়েছিল।
আসলে মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম দিকের বইগুলোয় যতটা যৌনতা ছিল, পরের দিকে তা অনেক কমে গেছে। রানা সিরিজের প্রায় ৪০০ বইয়ের মধ্যে প্রথম ১৫-১৬টায় একটু বেশি পরিমাণে থাকলেও পরের বইগুলোয় তা আছে নামমাত্র। একটা পর্যায়ে আমি নিজেই উপলব্ধি করলাম, আমরা একটা ধর্মভীরু ও রক্ষণশীল সমাজে বাস করছি, যেখানে আদিরসের উপস্িথতি একটি আঘাত। যারা পড়ছে, তারা লুকিয়ে পড়ছে। তাই আমি চাটনি কমিয়ে দিলাম। অনেক পাঠক এ জন্য অভিযোগ করেছেন যে, আমি তাঁদের বঞ্চিত করছি। আমি এখনও মনে করি, রস হিসেবে রানায় যৌনতার উপস্িথতি থাকলে ভালো হতো। কিন্তু সামাজিক পরিমন্ডলটাও বিবেচনা করতে হয়। আর এখন তো মনে হয়, আশপাশে যেভাবে গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দাপট বেড়েছে, তাতে ও পথে আর যাওয়াই যাবে না। তবে এটাও আমি জোর দিয়ে বলি যে, শুধু যৌনতা দিয়ে পাঠক টানার চেষ্টা আমি করিনি। কাহিনীর বৈচিত্র্য, অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য, রোমাঞ্চই রানাকে যুগের পর যুগ পাঠকপ্রিয়তা দিয়েছে।
আ. কিবরিয়া: অনেকেই তো আপনাকে উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন।
কা. আ. হোসেন: কবি আহসান হাবীব একসময় আমাকে প্রচুর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আধুনিক ও মুক্তমনের মানুষ ছিলেন। রানা লেখার পর যখন খুব সমালোচনা হচ্ছে, তখন তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে যা বলে বলুক, আপনি চালিয়ে যান।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সুসাহিত্যিকেরা লিখুক তো একটা ধ্বংস-পাহাড়! অতখানি খাটুনি করতেই পারবে না।’ তিনি আমার লেখা ছেপেছেন দৈনিক বাংলায়। স্েমহভাজন শাহরিয়ার কবির আমাকে দিয়ে গল্প লিখিয়েছে বিচিত্রায়। গল্প লিখতে আমি খুব আনন্দ পেতাম। কাজী মোতাহার হোসেন, অর্থাৎ আব্বুর উৎসাহও ছিল। তিনি আমাকে অনুবাদ করতে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুই কিছু অনুবাদ কর। তোর হাতে ভালো আসবে।’ আসলে মাসুদ রানা লেখার পর যে তীব্র সমালোচনা হতে থাকল, তাতে তিনিও বোধ হয় একটু বিচলিত হয়েছিলেন। সুফিয়া কামাল অনেককেই বলেছিলেন, ‘নওয়াবকে ধরতে পারলে পিট্টি লাগাব।’ হ্যাঁ, উৎসাহ পেয়েছি আমার প্রয়াত সেজো বোন খুরশীদা খাতুনের কাছে। সেই স্কুলের ছাত্রাবস্থায় আমার বানিয়ে বানিয়ে গল্প লেখার গোড়াতে পরিচর্যার কাজ করেছিলেন তিনি।
আ. কিবরিয়া: সেবা প্রকাশনীর বইয়ের শেষে আপনি ‘আলোচনা বিভাগ’ চালু করলেন। এটাকে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম হিসেবে এনেছিলেন আপনি। এ ধারণাটি কীভাবে মাথায় এসেছিল?
কা. আ. হোসেন: রানা নিয়ে যখন তুমুল নিন্দা-সমালোচনা ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, তখন ভাবলাম, আমারও কিছু বলার কথা আছে; বিশেষ করে পাঠকের কাছে। প্রচুর চিঠি আসছিল। তাই চালু হলো ‘আলোচনা বিভাগ’। পাঠকেরা আমাকে দারুণ সহযোগিতা করেছেন, সাহস ও উৎসাহ যুগিয়েছেন। রানার প্রথম দিকের বইগুলোর প্রথম সংস্করণ উল্টে দেখলে তুমি এর প্রমাণ পাবে। এর মাধ্যমে আমি পাঠকের আরও কাছে পৌঁছলাম। পাঠকেরা বিভিন্ন মুডে চিঠি লিখতেন, প্রশ্ন করতেন। অনেক বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন পেয়েছি, পেয়েছি চমৎকার পরামর্শ। সমালোচনাও এসেছে। আমিও বিভিন্নভাবে সে-সবের জবাব দিয়েছি।
আ. কিবরিয়া: মাসপয়লা নামে যে পত্রিকাটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, সেটাই তো রহস্যপত্রিকায় রূপ নিল। শুরুটা কীভাবে হলো?
কা. আ. হোসেন: সাংবাদিক রাহাত খানের তাগাদায় এটি প্রকাশের পরিকল্পনা হয়। হাশেম খান, রনবী (রফিকুন নবী), শাহরিয়ার কবির ও আরও অনেককে নিয়ে আলোচনায় বসলাম সেবা প্রকাশনীতে। আজকের সেগুনবাগিচায় যে জায়গাটিতে তিনতলার ওপরে লাইব্রেরিতে কাজ করি, ১৯৬৯-৭০ সালে সে জায়গাতেই ছোট একটি টিনের ঘরে ছিল সেবা প্রকাশনীর কার্যালয়। আমি নাম দিতে চেয়েছিলাম মাসপয়লা, কিন্তু অন্যদের তা অপছন্দ। সম্ভবত রনবী বললেন, ‘রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে যখন হচ্ছে, তখন এর নাম রহস্যপত্রিকাই হোক।’ সেটাই হয়ে গেল। হাশেম খান নামের লোগো-নকশা করলেন। ওই সময় তিনি নিয়ে এলেন অধুনালুপ্ত বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীকে। তিনি ‘শাচউ’ নামে লেখা শুরু করেছিলেন রহস্যপত্রিকায়। রাহাত খান ইত্তেফাক-এ যোগ দেওয়ায় আর তেমন সময় দিতে পারেননি। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে রহস্যপত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এতে লিখেছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, বুলবন ওসমান, মাহবুব তালুকদার, সাযযাদ কাদির, আবু কায়সার, বুলবুল চৌধুরী, রনবী, খোন্দকার আলী আশরাফ প্রমুখ। শাহরিয়ার কবির ছিলেন সহযোগী সম্পাদক। তিনি নিয়ে এসেছিলেন সাযযাদ কাদির, হুমায়ুন কবির ও মুনতাসীর মামুনকে। পরবর্তী সংখ্যাগুলোয় লিখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও লায়লা সামাদ। ওই সময়টা বড়ই জমজমাট ছিল। চারটি সংখ্যা বের হওয়ার পর অবশ্য মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হলে রহস্যপত্রিকার প্রকাশনা স্থগিত হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর সবাই বিভিন্ন কাজে বিভিন্নভাবে ব্যস্ত হয়ে গেল। শাহাদত চৌধুরী বিচিত্রায়, শাহরিয়ারও ওখানে। কারও হাতে সময় নেই। এক যুগের বেশি সময় পরে তিন গোয়েন্দা সিরিজের লেখক রকিব হাসান রহস্যপত্রিকা বের করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। তাঁর প্রবল উৎসাহে তাঁকেসহ নিয়মিত উপন্যাস লেখক শেখ আবদুল হাকিম ও নিয়মিত অনুবাদক নিয়াজ মোরশেদকে সহকারী সম্পাদক করে ১৯৮৪ সালে নতুন উদ্যমে রহস্যপত্রিকার প্রকাশনা আরম্ভ হয়। আসাদুজ্জামান হলেন শিল্প সম্পাদক। তিনি হাশেম খানের নকশাটি খানিকটা অদলবদল করে রহস্যপত্রিকার নামের লোগোটা করলেন। আসাদুজ্জামান বছরখানেক পর বিসিএস করে সরকারি চাকরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় চলে গেলেন। তখন কিছুদিনের জন্য দায়িত্ব নিলেন সিরাজুল হক। তারপর যোগ দিল শিল্পী ধ্রুব এষ। শেখ আবদুল হাকিম, রকিব হাসান বা নিয়াজ মোরশেদ কেউই এখন আর রহস্যপত্রিকার সঙ্গে নেই। সে জায়গায় এসেছে কাজী শাহনুর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন।
আ. কিবরিয়া: কেউ কেউ বলছেন সেবার অনুবাদের মান পড়ে যাচ্ছে। বাস্কারভিলের হাউন্ড, রিটার্ন অব শি, থ্রি কমরেডস, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট-এর মতো ক্লাসিকগুলোর যে চমৎকার অনুবাদ পাঠক পেয়েছে, এখন আর সে রকম পাচ্ছে না। নিয়াজ মোরশেদ, আসাদুজ্জামান, জাহিদ হাসানের মতো ধারালো অনুবাদককেও তো আর সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না।
কা. আ. হোসেন: এঁরা নামকরা ভাল ভাল বইগুলো অনুবাদ করে এখন যার-যার পেশায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নতুন লেখক আসছেন, এঁরাও ভাল অনুবাদক; কিন্তু পরে এসেছেন বলে ভাল বইগুলো ফসকে গেছে। এখন দশ হাতে কাজ হচ্ছে। ফলে মান একরকম রাখা তো সম্ভব নয়। তাই অভিযোগ কেউ করতেই পারেন। আমি শুধু বলব, তুলনাটা হচ্ছে কীসের সঙ্গে কীসের, সেটাও বিবেচনা করতে হবে। কাহিনির সঙ্গে কাহিনির, না কি অনুবাদকের সঙ্গে অনুবাদকের? এখন লেখার ধারায় পরিবর্তন এসেছে। ভিন্ন স্বাদের অনুবাদ হচ্ছে। সবাই ব্যস্ত। দুনিয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রুটিরুজিও কঠিন।
আ. কিবরিয়া: সেবার ব্যবসাপদ্ধতি ও লেখক সম্মানীর যে ব্যবস্থা চালু হয়েছিল ৪০ বছর আগে, তা আজও প্রায় একই রকম আছে। বাকির কারবার নেই। কমিশন সুনির্দিষ্ট। লেখকের ত্রৈমাসিক কিস্তি আছে। ১৫-২০ বছর পরও লেখক এসে তাঁর জমে থাকা অর্থ নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে সেবা বা প্রজাপতির পক্ষে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা শেষ পর্যন্ত কি সম্ভব হবে?
কা. আ. হোসেন: কিছুটা ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মধ্য দিয়ে আমরা এ ব্যবস্থাগুলো চালু করেছিলাম এবং আজ পর্যন্ত ধরে রেখেছি। সেবা ও প্রজাপতিতে কোনো বাকির কারবার নেই। কালি-কাগজ কেনা, বই বাঁধাই ইত্যাদি সব কাজেই নগদ লেনদেন। শুধু জিনিসগুলোর চালান আসার পর দেখে-শুনে-বুঝে নিতে যেটুকু সময় যায়; তারপর পাওনাদার তাঁর অর্থ পেয়ে যান। একইভাবে বাকিতে বই বিক্রি করি না। অনেকের চেয়ে বইয়ের দামও কম, কমিশনও কম। এ নিয়মে কোনো ব্যত্যয় না করায় কাগজ বিক্রেতা থেকে আরম্ভ করে বইয়ের ডিলার−সবারই আমাদের ওপর একটা আস্থা চলে এসেছে। তাঁরাও সহযোগিতা করতে দ্বিধা করেন না।
আর বই বের হওয়ার এক মাস পর বেচাকেনার হিসাবে নির্দিষ্ট হারে লেখককে রয়্যালটি দিয়ে দিই। এরপর তিন মাস অন্তর বিক্রির হিসাবে তাঁর যা পাওনা তা জমা হতে থাকে। লেখক সুবিধামতো সময়ে সেই অর্থ তুলে নেন। যতদিন বই গুদামে থাকবে এবং বিক্রি হবে ততদিন তিনি কিস্তি পেতেই থাকবেন।
আ. কিবরিয়া: আজকের বাংলাদেশে সেবা প্রকাশনী একটি বিশাল প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার কথা। সেবা অনুরাগীরা সেই স্বপ্নই দেখে। সেটি হলো না কেন?
কা. আ. হোসেন: স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক অনেক। মানুষ আগে খেয়ে-পরে বাঁচবে, তারপর না বই কিনবে। সব টাকা যদি খাওয়া-পরার পিছনেই চলে যায়, ইচ্ছে থাকলেও তো বই কেনা যায় না। প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হলে সেবা অনেক বড় হতো। সেটি হয়নি। সে জন্য আক্ষেপও নেই। তবে বাংলাদেশের সুখ-সমৃদ্ধি আসবে, এই স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? একদিন সেটা সত্য হতেও তো পারে!
প্রথম আলো, সাহিত্য সাময়িকী, ১৮ই জুলাই ২০০৮

শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩

কোটা(কিংবা গলার কাঁটা) নিয়ে যা ভাবছি

বিসিএস পরীক্ষায় কোটা বিলোপ (কিংবা সংস্কার) নিয়ে গত তিন চারদিনে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে গোটা ঢাকাবাসীকে সেই সাথে অনলাইনের নেটিজেনদেরকেও।পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তি তর্ক আর মাঠে পুলিশ-ছাত্রলীগের লাঠিপেটার মধ্য দিয়ে আপাতত এই আন্দোলনের একটা সমাপ্তি হয়েছে।সরকারের তরফ থেকে ফলাফল পুনরায় মূল্যায়নের ঘোষণা এসেছে তবে সেই সাথে এও জানানো হয়েছে যে কোটা পদ্ধতিতে আপাতত কোন পরিবর্তন আসছে না। এই আন্দোলনকে নিছক শিবির কিংবা মৌলবাদীদের আন্দোলন বলে যারা উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে এরা হয় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী আর নয়তো অজ্ঞ।প্রতিটা আন্দোলনেই একটা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী থাকে এবং এরা ফায়দা লুটার এক চেষ্টা সবসময়ই করে থাকে।কিন্তু এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীকে হাইলাইট করে যদি গোটা আন্দোলনের পালস বুঝতেই অক্ষম হয় তবে তাদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কিছুই বরাদ্দ থাকে না।
বিসিএস পরীক্ষায় সফলতা অর্জনের মাধ্যমে যারা সিভিল সার্ভিসের পদস্থ কর্মকর্তা হন তাদের আসলে কতটা যোগ্য হওয়া উচিত?এই ব্যাপারে অন্তত কেউই দ্বিমত পোষণ করবেন না যে একটা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা যত দক্ষ ও বিজ্ঞ হবেন দেশ ও ততটাই উন্নত হবে।কিন্তু ৫৬ ভাগ পদের অধিকারীরাই যখন কোটা বা বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে চেয়ারগুলোতে আসেন তখন এদের কাছ থেকে উন্নত সেবা বা দক্ষতার আশা করাটা ও বাতুলতা বৈকি অন্য কিছু নয়।আলাপচারিতা রেখে আলোচনায় যেতে চাই।
প্রথমেই এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে।
১৯৮৬ — জাতীয় তালিকা — এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮।
১৯৮৮ — মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের করা তালিকা –৭০ হাজার ৮৯২।
১৯৯৪— জাতীয় তালিকা —-১ লক্ষ ৫৬ হাজার
১৯৯৮ —মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তালিকা —এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ ১৯৯৯–মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল — এক লাখ ৫৪ হাজার ৪৫২
২০০৫– চারদলীয় সরকার প্রকাশিত গেজেট–এক লাখ ৯৮ হাজার ৫২৬
বর্তমান–দুই লাখ চার হাজার ৮০০
২০১০— সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম প্রকাশ করে ‘মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধকৌশল ও সামরিক শক্তি বিন্যাস’ শিরোনামে একটি নথি প্রকাশ করে। সে হিসাব অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৬২ হাজারের বেশি না।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ বীর-উত্তম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কোনোভাবেই এক লাখ ৫০ হাজারের বেশি হতে পারে না। আর এই ৪২ বছরে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কমার কথা থাকলেও এখন বাড়ছে। এতে বোঝা যায়, কিভাবে তালিকা তৈরি হচ্ছে?’
.
সূত্র: কালের কন্ঠ ১৯/০৫/১৩, প্রথম আলো ১৫/১২/১২
এই কোটা কারা কিভাবে ব্যবহার করছে সেটা সেটা বুঝার জন্য সিনিয়র ব্লগার শ্রদ্ধেয়রাসেল পারভেজ ভাইয়ের বেশ কয়েকটা স্ট্যাটাসের সংকলিত অংশ উদ্ধৃত করা খুব জরুরি মনে করছি
১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ভেতরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণরত মানুষদের সর্বমোট সংখ্যাটা ১ লক্ষ ২০ হাজারের বেশী হবে না। সেকটর কমান্ডার শফিকুল্লাহ এবং সেক্টর কমান্ডার কাজী নূর উজ্জামানের মতামত এমনই। এদের একটা অংশ বলা বেশ বড় একটা অংশের (৫০% এর উপরে) শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলো এসএসসি পাশ কিংবা তার উপরে।
এরা শিক্ষিত এবং এরা পরবর্তীতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে সরকারী চাকুরিতে যোগদান করতে পারতেন, অনেকে স্বাধীন ব্যবসায়ে যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু সরকারী চাকুরিতে ন্যুনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাশ হওয়ায় হয়তো ৬০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আমাদের সহায়তা করার প্রয়োজন ছিলো, এদের ভেতরে যারা কৃষক ছিলেন, তারা যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তাদের পূর্বের পেশায় ফিরে গেছেন, তারপরও আমরা ধরে নিচ্ছি আমাদের ৫০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা করার খুব বেশী প্রয়োজন ছিলো।
মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্টের কাছে যে পরিমান প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ছিলো, তাতে এই ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়ে যেতো এবং যারা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তাদের পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করা যেতো। কিন্তু আমার গত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে আমরা এই ৫০ হাজার মানুষকে কোনোভাবেই পুনর্বাসন করতে পারি নি। বিপুল সম্পদ থাকার পরেও মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট ১ লক্ষ মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দিতে পারে নি। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ এর তত্ত্বাবধানে থাকা মানুষগুলো লুণ্ঠন করেছে কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে।
যাদের কল্যানের জন্যে এতো কিছু করা হলো তাদের বিন্দুমাত্র কল্যান হয় নি, বরং আমরা এই মুহূর্তে অনাকাঙ্খিত একটা বিতর্কে জড়িয়ে পরেছি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-সন্ততি এবং নাতিদের জন্যে ৩০% কোটা বরাদ্দ রাখা উচিৎ।
আমি জানি দেশের ৯৯% মানুষের জন্যে ৪৪% সীট বরাদ্দ রাখাটা অন্যায় এবং একই ভাবে দেশের দশমিক ০৩ শতাংশ মানুষের জন্যে ৩০% সীট বরাদ্দ রাখাটা ঘোরতর অবিচার। এখানে যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা সাথে মুক্তিযুদ্ধের আবেগের স্যালাইন বানানোর প্রয়োজন নেই।
দেশের পাকিস্তানী মালিকানাধীন অধিকাংশ শিল্প কারখানা এবং একই সাথে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বশে আরও অনেক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ- সম্পত্তি মুক্তিযোদ্ধা কল্যান তহবিলে দান করা হয়েছিলো। সেটার মালিকানা মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্টের হাতে ছিলো এবং এখনও আছে। এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ দিয়েও আসলে দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যান করা সম্ভব হয় নি, এখনও মুক্তিযোদ্ধারা অভাবে আত্মহত্যা করে চিরকুটে লিখে যান
” মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম জীবনযুদ্ধে হেরে গেলাম।”
প্রচুর সম্পদ আয়ত্বে থাকার পরেও দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক পুনর্বাসন করা যায় নি, মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের আবেগ রাজনীতির পণ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, কয়েকজন স্বার্থান্ধ মানুষ ব্যক্তিগত লভ লালসা পুরণের জন্যে বিপুল সম্পদ নয় ছয় করেছেন।
এটা নিয়ে অনেক ধরণের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া যায়, আবেগ তৈরি করা যায় কিন্তু দেশের সীমিত চাকুরি বাজারে নিশ্চিত সরকারী চাকুরির লড়াইয়ে এক ধরণের অন্যায্য প্রতিবন্ধকতা স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিযোগিরা মেনে নিবেন না। সরকারী চাকুরেদের অনেক ধরণের সত্যায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তাদের যে সম্মানের জায়গায় তুলে রাখা হয়েছে সেটা ধরে রাখার দায়িত্ব আসলে সরকারের উপরেই বর্তায়।
এই লেখাগুলোর বিপরীতে কেউ যদি উপযুক্ত যুক্তি নিয়ে সামনে আসতে পারেন তবে সাদরে আমন্ত্রণ রইল।আর হ্যাঁ, প্রথম আলোতে একটা খবর পড়ে দেখতে পারেন।অন্য অনেকের কথা বাদই দিলাম।এক জন বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারকে এভাবে রেখে আমরা প্রতিনিয়ত চেঁচিয়ে যাচ্ছি মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে।মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা আর কাকে বলে!এত সব কিছুর পরেও আমি মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখার পক্ষপাতী এবং সেটা ৭% এর বেশি হওয়াটা উচিত না বলেই মনে হচ্ছে।এটা যদি কম মনে হয় তবে তার পিছনেও একটা ব্যাখ্যা আছে।সেটা পড়লেই আশা করি বুঝতে পারবেন।ওভার জেনারালাইজ করা হলেও মোটামুটি ব্যাপারটা এমনই।
এবার উপজাতি কোটা নিয়ে আলোচনায় আসা যাক।উপজাতি কোটার পুরো সুবিধাটা এক তরফাভাবে নিচ্ছে চাকমারা।এবং জানলে অবাক হবেন এদের স্বাক্ষরতার হার বাংলাদেশের ভিতরে ৬৩ শতাংশ এবং সামগ্রিকভাবে ৭৫ শতাংশ।আর হ্যাঁ গড়পড়তা বাংলাদেশীদের চাইতেও এরা বেশ ভালোই আছে।।এখন কোটা প্রথা যদি রাখতেই হয় তবে এদের বাদ দেওয়াটা বেশ জরুরি।মারমারা ও বেশ তাড়াতাড়ি তাদের ছুঁয়ে ফেলবে বলেই মনে হচ্ছে।আমার নিজের অভিজ্ঞতাও বলে গত পাঁচ ছয় বছরে ক্যাম্পাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে উপজাতীয় ছাত্র ছাত্রী বেড়েছে।কিন্তু অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে এমন ও দুর্গম সব অঞ্চল আছে যেখানে পৌঁছানোর জন্য মাইলের পর মাইল কেবল পায়ে হাঁটা রাস্তাই মিলে।সেখানে স্কুল বলতে হয়তো কিছুই নেই।ভাষাগত দূরত্ব তো আছেই।এই সব বঞ্চিতদেরকে মূলধারার সাথে তুলে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কোটা সুবিধা যাতে এরাই পায় সেটা নিশ্চিত করা উচিত।আমার মতে এদের জন্য বর্তমান ৫%ই যথেষ্ট।
বাকি রইল প্রতিবন্ধী কোটা।শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় পড়তে আসে এবং সাফল্যের সাথে পাশ করে সেটার জন্যই এদেরকে হাজারটা স্যালুট দেওয়া যায়।মোট জনগোষ্ঠীর খুব ছোট একটা অংশ অর্থাৎ মাত্র ১.৩২% হলেও এদের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত ৩% ।
তাহলে নারী আর জেলা কোটা?এই দুই কোটা রাখার কোন যৌক্তিকতা আমি দেখিনা।জেলা কোটা তো কোন যুক্তিতেই এখন আর সম্ভব নয়।কোন কোন জেলা হয়তোবা তুলনামুলকভাবে অন্যদের চাইতে পিছিয়ে আছে।কিন্তু সেটার জন্য কোটা প্রথা কোন সমাধান হতে পারেনা।আর বাংলাদেশের নারীরা এখন যথেষ্ট এগিয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা নারীর মোট সংখ্যা এবং ফলাফলে সামনের দিকে নারীদের অবস্থান সেটাই প্রমাণ করে। নারীরা যেটা পিছিয়ে আছে মনে হচ্ছে সেটা মূলত সামাজিক সমস্যা।কেননা অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে গৃহিণী হিসেবে দেখতেই পছন্দ করছেন।যেহেতু সরকারী চাকুরেকে দেশের নানা জায়গায় বদলি করা হয়,সেহেতু অনেক নারীর পক্ষে এ ধরনের চাকরীতে আসা একটু সমস্যার বটে।তার সাথে আছে জমকালো প্রাইভেট চাকরির হাতছানি।তাই নিতান্তই কোটা রাখতে চাইলেও তা ১% এর বেশি হওয়া কোনভাবেই উচিত না।
অন্য অনেকের মত আমিও মনে করি কোটাপ্রথা কোন চিরস্থায়ী সমাধান হতে পারেনা।একটা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত যে কখন থেকে কোটাব্যবস্থা শারীরিক প্রতিবন্ধী ছাড়া আর সবার জন্য সম্পূর্ণরূপে বিলোপ হবে।কারণ কোটা প্রথা বহাল থাকার অর্থ আমরা উন্নয়নের আলো সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছাতে পারিনি।আর এটা নিশ্চয় আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন জাতির জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক কিছু নয়।
পুনশ্চঃঅনেকেই মনে করছেন মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে গালি দেওয়ার কারণে এই আন্দোলনকে কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই,এই ধরনের কিছু হলে অবশ্যই সেটা কোন না কোন টিভি ক্যামেরা কিংবা কারো মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা দেখতাম।ইত্তেফাক জানাচ্ছে
তারা শ্লোগান তুলেন—’৩৪তম বিসিএস-এর গুণাগুণ, ২ লাখ মেধাবী খুন’। এছাড়াও আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—’কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা নিপাত যাক; ছি, ছি, ছি, পিএসসি, এটা তুই করলি কী; মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় দুই নীতির ঠাঁই নাই, শহীদদের রক্তস্নাত বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই; কোটা দিয়ে কামলা নয়, মেধা দিয়ে আমলা চাই’।
এর বাইরে অন্য কোন খবর কারো চোখে পড়লে নজরে আনার অনুরোধ করছি।এরশাদ সিন্ড্রোমে ভুগার মত বুদ্ধু আপনি নন বলেই আমি বলেই আমি মনে করি :love:

সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

এভাবে কি মুসলিম নারী হেফাজত করা যায়?

গতকাল সন্ধ্যায় ফেসবুকে লগইন করতেই দেখি কেবল তেঁতুল আর তেঁতুল :thinking: ঘটনা কি তলিয়ে দেখতেই দেখি এক ভিডিওর কারণে এত মাতামাতি।
আল্লামা শাহ আহমেদ শফির এক বক্তব্যের কারণে এত সমালোচনা।বিতর্কিত সেই বক্তব্যের উল্লেখ্যযোগ্য অংশ হলঃ
* আপনি স্বামীর ঘরের মধ্যে থাইকা উনার আসবাব পত্র এগুলার হেফাজত করবেন।
* জেনা কইরা টাকা কামাই করতেসে, বরকত থাকবে কেমনে?
* আপনারা মেয়েদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে লেখাপড়া করাইতেসেন। কেন করাইতেসেন? তাদের ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়াইবেন যাতে বিবাহ শাদী দিলে স্বামীর টাকা পয়সার হিসাব রাখতে পারে।
* যতই বুজুর্গ হন আপনার মনের মাঝে কু খেয়াল আইসা যাবে। কেউ যদি বলে মেয়ে মানুষ দেখলে আমার দিলের মাঝে লালা ঝরে না, তাহলে বলব তোমার ধ্বজভঙ্গ রোগ আছে। তোমার পুরুষত্ব নস্ট হয়া গেসে। তাই মহিলাদের দেখলে তোমার কু ভাব আসে না।
* “জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল হল পুরুষদের মরদ থাইকা খাসী কইরা ফেলা।
* পারলে চাইরটা পর্যন্ত বিবাহ করবা। খাওয়াইবো তো আল্লাহ। বার্থ কন্ট্রোল করবা না। এইটা বড় গুনাহের কাজ।”
এই অভিযোগ অনেকদিনের পুরাতন যে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী জলসা মাহফিলে নারী প্রসঙ্গ আসলেই নানাভাবে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত কথা শোনা যায়।নারীকে কেবল শুনানো হয় পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা।কিন্তু সমাজ তাকে বিনিময়ে কি দিবে এবং সেগুলোর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই দেখা যায় না।এইসব ব্যাপার সামনে এনেই দাবী করা হয় ইসলাম নারী বান্ধব নয়।কিন্তু আসলেই কি তাই?বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের সময়-সুযোগ না থাকলেও চেষ্টা করলাম কেবল আল্লামা শাহ আহমেদ শফির উপরোক্ত দাবী খন্ডনের।
রাসূলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেন,তোমাদের যে কারো যদি তিনজন কন্যা বা বোন থাকে আর সে তাদের সুন্দরমত দেখাশুনা করে,তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।(তিরমিযী)
তেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাঃ আরো ইরশাদ করেছেন,তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।(তিরমিযী)
হুজুর কিভাবে নারীরে দমন করা যায়,তার ব্যাপারে এতকাল শিখিয়ে এসেছেন।কিন্তু ইসলাম নারীকে কি মর্যাদা দিল, সেটা কেন শোনান নাই?নারী স্বামীর আসবাব আর টাকা পয়সার হেফাজত করবে কিন্তু নারীর অধিকারের হেফাজত হবে কিভাবে,সেইটা কেন বললেন না?নারীরে প্রাপ্য বুঝিয়ে না দিলে আল্লাহ কি শাস্তি দিবেন,সেইটা কেন ওয়াজ-বয়ানে বলেন না??মেয়েরা যদি ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্তই পড়ে,চিকিৎসক না হয় তাহলে ঘরের মা-বোন-কন্যা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে কার কাছে যাবে?কিংবা ঐ ফোর ফাইভ পর্যন্তই বা কার কাছে পড়বে?যেহেতু আমাদের পুরুষদের বুজুর্গ হলেও নারী দেখলে ‘লালা ঝরে’,সেহেতু দুনিয়ার কোন নারীই আমাদের কাছে নিরাপদ না।কি বলেন?তাহলে আর চোখের-গোপনাঙ্গের হেফাজতের আয়াত-হাদিস বর্ণনা করা কেন?
বার্থ কন্ট্রোল এমন একটা ইস্যু যেটার ব্যাপারে আমার জানামতে এখন পর্যন্ত ইসলামে কোন ফাইনাল ডিসিশন নাই।তবে দারিদ্র্যের ভয়ে কেউ যাতে সন্তান হত্যা না করে সে ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কঠোর নির্দেশনা আছে।রিজিকের মালিক অবশ্যই আল্লাহ,তবে উনি আমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর সময় আমার মাথায় ‘মগজ’ নামে একটা জিনিস ও ঢুকিয়ে দিয়েছেন।আপনি হয়তো রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করতে পারেন,কিন্তু ঐচ্ছিক জন্মনিয়ন্ত্রণ এর না।
ইসলাম কেন চারটা পর্যন্ত বিবাহের নির্দেশ কেন দিয়েছে সেটার কিছু কন্টেক্সট আছে।কারো মনে চাইল আর ধুম করে গিয়ে বিয়ে করে ফেলল-ব্যাপারটা তেমন না।যে আয়াতে আল্লাহ চার বিয়ের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন,তার শেষে এই লাইনটা ও আছে, ‘আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না,তবে একটি…’(সূরা নিসাঃ৩)
আবার তাদের মধ্যে যে শতভাগ সমতা রক্ষা যে অসম্ভব সে কথা ও বলে দিয়েছেন আল্লাহ।ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা যতই কামনা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে কখনো পারবে না।সুতরাং তোমরা (একজনের প্রতি) সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড় না…(সূরা নিসাঃ১২৯)
হুজুর আল্লাহর ওয়াস্তে তথ্য সন্ত্রাস করবেন না।আমরা মুসলিমরা এমনেই অনেক প্যারার মধ্যে আছি।আপনারা যদি নতুন করে এইসব রসালো কথাবার্তা বয়ান হিসেবে দেন,তখন আমাদের কাছে অসহায় মনে হয়,বিপন্ন মনে হয়।ইসলামের আবির্ভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে,সে পুরোহিতবাদ ঠেকিয়ে দিয়েছে।কিন্তু আপনাদের অবস্থা দেখলে মনে হয়,আপনারা সেটা আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
আল্লাহ সকলের মঙ্গল করুক

সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৩

ছোট্ট গ্রামের যান্ত্রিকতার ১৫০ বছর

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়,আমার বড় খালা তখন ২০-২২ বছরের এক বিবাহিতা তরুণী।১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হওয়াতে ইতিমধ্যেই এক ছেলে-এক মেয়ের মা।বড় খালু তখন শেল পেট্রোলিয়ামের চাকুরে।চট্টগ্রামে মোটামুটি ঝুটঝামেলা বিহীন একটা নিরুপদ্রব জীবন।কিন্তু যে-ই না যুদ্ধ শুরু হল,তখন আমার খালা-খালুর অকুল পাথারে পড়ার দশা।চট্টগ্রামে আপনজন বলতে কেউ নাই।নিরাপদ আশ্রয় মানে কেবলই নোয়াখালী।কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে সেখানে যাওয়াটা আর নিজের মাথা গিলোটীনে পেতে দেওয়া একই কথা।এমন সময় যেন দেবদূত হয়ে এলেন উনাদের পাশের ফ্ল্যাটেরই বাসিন্দা মহিলা।তিনিই প্রস্তাব করলেন,তাঁর সাথে বাবার বাড়ি বাঁশখালি যাওয়ার।মাত্র বছরখানেকের পরিচয়ে এক তরুণীকে এই মহিলা কেন এমন বড়বোনের স্নেহে নিজ বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সেটাই এক রহস্য।যেহেতু অন্য কোন উপায় ছিল না,আমার বড় খালা তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে এক রাতে রওনা হলেন সেই মহিলার পরিবারের সাথে।বিশাল এক ছইওয়ালা নৌকায় তিনদিনের ভয়ার্ত এক ভ্রমণের পর পৌঁছালেন বাঁশখালি।সেই বাড়িতেই এক সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমার খালা ছিলেন প্রায় দুই মাস।নিজের আপনজনের দুশ্চিন্তা যাতে খালার মাথায় ভর না করে কিংবা কখনোই যেন এই বাড়িকে পরের বাড়ি মনে না হয় সেজন্য সেজন্য এই দুইমাসে পুঁথিপাঠের আসর,লাঠিখেলা,যাত্রাপালা সহ নানা স্থানীয়-লোকজ আয়োজনে সময়টাকে আনন্দময় করে রেখেছিল তারা।পরে যুদ্ধের প্রচন্ডতা কিছুটা কমতেই নোয়াখালি ফেরত গিয়েছিলেন আমার খালা।খালা যেদিন বিদায় নিচ্ছিলেন সেই বাড়ি থেকে,সেদিন শুধু খালার সম্মানার্থেই আয়োজন করা হয়েছিল এক ফিস্টের।আমার দুই খালাত ভাই বোনের হাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল তখনকার ১০+১০=২০ টাকা।
শুনতে কিছুটা অস্বস্তিকর যে সারা দেশ যখন পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্তির জন্য পাগলপারা হয়ে আছে তখন একটা পরিবার আনন্দ-ফুর্তির মধ্যে সময় কাটাচ্ছে।কিন্তু আমার কাছে এর একটা অন্য মানেও আছে।কারো মনের দুশ্চিন্তা দূর করতে এমন প্রাণান্ত চেষ্টা মানুষের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে।চট্টগ্রামের মানুষগুলোই হয়তোবা এমন!আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও এমনটাই বলে।আমার কেন জানি মনে হয়,কোন জায়গার ভৌগলিক অবস্থানের সাথে সে এলাকার মানুষের মন-মানসিকতার কোন একটা যোগসূত্র থাকে।চট্টগ্রামে পাহাড় আর সাগর আছে বলেই হয়তো কে জানে এখানকার মানুষগুলোর আচরণ ও বোধহয় অন্যরকম উদার।আপাতদৃষ্টিতে এখানকার মানুষের ভাষা-ব্যবহার কর্কশ মনে হলেও এরা কাউকে যদি একবার পছন্দ করে,তবে তার জন্য হয়তো জীবন ও দিতে পারবে।অনেকটা মুখে বিষ,অন্তরে মধু টাইপ অবস্থা! মানুষকে বিশ্বাস করার অবিশ্বাস্য একটা ক্ষমতা আছে এদের মধ্যে।মাত্র কয়েক বছর আগেও কোটি কোটি টাকার ব্যবসা কেবল মৌখিক কথা আর বিশ্বাস এর উপরেই করতেন খাতুনগঞ্জ-আসাদগঞ্জ এর পাইকারি ব্যবসায়ীরা।চাঁটগাবাসীর অতিথি আপ্যায়ন আর ভোজনবিলাসিতার সুনাম তো সারাদেশ জুড়েই বিস্তৃত।আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়,চিটাগং এর মানুষের পারিবারিক বন্ধন।সারা পৃথিবী জুড়ে যেখানে একক পরিবারের সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয়তা বাড়ছে,সেখানে চিটাগং দেখবেন যৌথ পরিবারের প্রাণচাঞ্চল্য!এই বন্ধন কতটা দৃঢ় আর শক্তিশালী সেটা বুঝার জন্য চিটাগং এর কোন সামাজিক-পারিবারিক অনুষ্ঠানে আসলেই বুঝবেন।চাচাত কিংবা অন্য সব দূরের আত্মীয়ের সাথে এদের যে হৃদ্যতা,সেটা অনেক স্থানের আপন ভাই বোনের মধ্যেও আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।
মানুষগুলো এমন বিশ্বাসী, চমৎকার আর প্রাণখোলা বলেই হয়তো চট্টগ্রামের উন্নয়ন হয়না।দেশের অর্থনীতির বেশ উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নির্ভরশীল হলেও এর আয়ের খুব ছোট একটা অংশই খরচ হয় এখানে।নামকাওয়াস্তে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’!ঢাকা নিয়ে যত জল্পনা- কল্পনা তার অর্ধেকটা যদি এই সবুজ শহরকে নিয়ে হতো,তাহলে দেশের অবস্থাটা ও হয়তো অন্য রকম হতো।ছোটবেলা থেকে যে চট্টগ্রামকে দেখতে দেখতে বড় হচ্ছি,সেটা কেমন জানি বদলে যাচ্ছে।প্রচুর মানুষ,ট্রাফিক জ্যাম,ক্রমক্ষয়িষ্ণু সবুজ,যত্রতত্র নোংরা আবর্জনা এইসব মিলিয়ে একটা প্রাণউচ্ছল শহর কেমন জানি ধুসর হয়ে যাচ্ছে।তারপরেও এই শহরটা কেমন জানি মায়াবতী টাইপ।পাহাড়-নদী-সাগরের এই শহরে কখনো মন খারাপ হয় না!কখনো যদি শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হয়,মনটা যেন কেমন করে।সিটিগেইট যখন পিছনে ফেলে আসি,মনে হয় কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি।কে জানে,নিজের শহর নিয়ে সবার অনুভূতিটাই হয়তো এমন।তা না হলে পৈতৃকবাড়ি নোয়াখালী আর সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের পুলিশ কোয়ার্টারে জন্মানো একটা ছেলের চিটাগং নিয়ে এমন অনুভূতি থাকবে কেন?
পুনশ্চঃবিনা হেতুতে এত কিছু লেখার কারণ আমার প্রিয় এই নগরীর সিটি করপরেশান ১৫০ বছরে পা দিয়েছে।১৮৬৩ সালে মাত্র চারটা ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি এখন ৪১ ওয়ার্ডের চট্টগ্রাম সিটি করপরেশান।একটা মফঃস্বল শহর যখন পৌরসভা বা সিটি করপরেশানএ রূপ নেয় তখন আমার মনে হয় এর মধ্যে যান্ত্রিকতার আমদানি হয়।আর ধারণা করা হয় ছোট্ট গ্রাম থেকেই চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব!

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

বইয়ের পোকা গ্রুপে পোস্ট

১.অনীশ দাস অপুরে মূলত চিনি তাঁর হরর গল্পের জন্য।অসাধারণ সব গা-হিম করা গল্প লিখেন।সেবা প্রকাশনীর একরকম সমার্থক হয়ে গেছেন বলা যায়।সেবা প্রকাশনী থেকে যেসব গল্পসংকলন বের হয় তার বেশিরভাগই উনার সম্পাদনায় বের হয়।এর আগে পড়েছিলাম হিচ-হাইকার।আর এবার পড়লাম "অতল পৃথিবী"।এই বইয়ের উপর মন্তব্য করা মানে শব্দের অপচয়!
একেকটা থেকে একেকটা গল্প এত অসাধারণ।এই বইয়েই একদম নতুন কিছু লেখকের নাম জানলাম যাদের নাম আগে কখনোই শুনিনি(আমি এমনেতেও অনেকের যে নাম জানি তেমনটা না!)।
অতিরিক্ত ভালো লাগার গল্পগুলোর নাম বলে যাই।টাইটেল গল্প "অতল পৃথিবী" জুল ভার্নের লেখা।জুল ভার্নের মাথাটা সংরক্ষণ করা খুব জরুরি ছিল।এমন লেখা কিংবা এমন ভাবনা এই লোক কিভাবে করতেন গবেষণা হওয়া দরকার।গল্পটা পড়ার পরে আমি নিজেও অতল ভাবনায় হারিয়ে গেলাম।মাথা চুলকাই আর ভাবি কোথা থেকে আসলাম আর কোথায় যাব!

ও' হেনরির 'বিশ বছর পর' গল্পের শেষটা পড়ে চমকে গেছি বলা যায়।হেলেন নেলসনের এর 'সাক্ষী ' কিংবা উইলিয়াম এফ নোলান এর হরর সায়েন্স ফিকশনটা বেশ ছিল।

যেহেতু সেবা প্রকাশনীর বই সেহেতু গোয়েন্দা গল্প বাছাইয়ে ভালো নজর থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।স্যার আরথার কোনান ডায়েলের শারলক হোমস সিরিজের একটা গল্প আছে।আছে বিশ্ববিখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচককের ঘড়ি রহস্য নিয়ে চমৎকার একটা গল্প।আগাথা ক্রিস্টির ও 'ভয়' নামে অন্য রকম একটা গল্প আছে।পুরো বইটাই অসাধারণ।আর অনুবাদকদের কথা না বললেই নয়।বাংলাদেশের সবচাইতে সেরা সব অনুবাদক নিয়ে সম্ভবত সেবা প্রকাশনী বসে আছে।তাদের সবার জন্য (y)

পরবর্তী সংকলন 'ঘাতক সময়' পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

২.ভবিষ্যৎবাণী করার ব্যাপারে আমি খুব একটা অভিজ্ঞ না হলেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি বাংলাদেশের থ্রিলার লেখালেখির জগতে দিকপাল হয়ে উঠবেন মাশুদুল হক।অসাধারণ লিখেন।তার ভেন্ট্রাকুইলিস্ট পড়লাম।বেশ চমৎকার।থ্রিলার পড়ি না অনেকদিন।তবে এই বইটা পড়ে থ্রিলারের জন্য পুরাতন ভালোবাসা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো :D বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে সরাসরি তুলে দেই।

বিয়ের অনুষ্ঠানে অনেকদিন পর দেখা হয়ে যায় পুরনো বন্ধুদের, দুই বন্ধু নৃতাত্ত্বিক মারুফ এবং পত্রিকার ফিচার এডিটর রুমি কথা প্রসঙ্গে জানতে পারে তাদেরই আরেক বন্ধু পেশা হিসেবে নিয়েছে ভেন্ট্রিলোকুইজম। কৌতূহলী হয়ে সেটার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ওরা জড়িয়ে পড়ে দারুণ রহস্যময় এক অনুসন্ধানে, বেরিয়ে আসে ভয়ংকর আর শিউরে উঠবার মত সব সত্য, সাধারণ মানুষকে কখনোই জানতে দেয়া হয় না এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক সম্প্রদায়ের কথা। যার পদে পদে ওদের জন্য ওৎ পেতে আছে মৃত্যুগামী বিপদ, অভাবনীয় বিস্ময়, জড়িত আছে ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের জীবন, এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র । ভেন্ট্রিলোকুইস্ট শুধু একটি উপন্যাসই নয়, পাঠকদের জন্য ইতিহাস, স্থাপত্য, গণিত, ধর্মতত্ত্ব আর বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব যাত্রা।

***বইয়ে ব্যবহৃত সবগুলো ফ্যাক্টই দালিলিক ভাবে প্রমাণিত

৩.মাহবুব মোর্শেদের প্রবন্ধ কিংবা পলিটিক্যাল লেখা পড়লেও কোন গল্প-উপন্যাস আগে কখনো পড়া হয়নি।ইদানীং কেন জানি গল্প-উপন্যাস ও আর ওইভাবে ভালো লাগে না।টাইম পাসের জন্য পড়া অনেকটা।কিন্তু 'ফেস বাই ফেস' উপন্যাস পড়ে বেশ চমৎকার লাগলো।ভিন্ন টেস্টের।প্রতিদিনের ফেসবুক জীবন আর তার সাথে বাস্তব জীবনের সংশ্রব নিয়েই বইটা।শহরবাসী মধ্যবিত্তের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বই।বইয়ের প্রায় শেষদিকে একটা চমক আছে।নানা শারীরিক অন্তরঙ্গতার কথা গল্প-উপন্যাসে থাকে কিন্তু এই বইয়ের শেষদিকে যে চমকটা আছে সেটা আমি অন্তত আমার পড়া অন্য কোন বাংলা বইতে পাইনি।বইয়ের মত বইয়ের রিভিউটাও ভালোই লিখেছেন সালাহউদ্দিন শুভ্র।বইটি ফ্রি ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুনhttp://www.boierdokan.com/uploads/9/2/4/3/9243378/face_by_face.pdf

৪.পড়ছেন বই কিন্তু মনে হবে কথোপকথন শুনছেন!একজন প্রমিত ভাষায় চমৎকার সব প্রশ্ন করে যাচ্ছেন আর বয়স্ক একজন ভদ্রলোক সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন ঢাকাইয়া বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে।পাশ থেকে আরেক ভদ্রলোক টুকটাক সম্পূরক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন।বইটা যারা পড়েছেন তারা ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন বইটা হচ্ছে সরদার ফজলুল করিমের 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ-অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে আলাপচারিতা'।এত চমৎকার একটা বই।লেখকের মুন্সিয়ানার কারণে মনে হবে জলজ্যান্ত তিনজন মানুষ আপনার সামনে বসেই কথা বলছেন।এই আলাপচারিতাতে উঠে এসেছে ১৯ শতকের পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজের কথা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোঁড়ার দিকের কথা,তার বিকাশ,সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা সহ আর ও অনেক কিছু।এমন এক অধ্যাপকের পরিচয় পাবেন যিনি সারা জীবন কেবল জ্ঞানসাধনা করে গেছেন।কোন অন্যায়এর সাথে আপোষ করেননি।বইয়ের শেষদিকে আছে আরেক জ্ঞানতাপস অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেনের সাথে আলাপচারিতা।তিনি তখন অনেক বয়স্ক।স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এমন একটা অবস্থা।তারপরেও জানিয়েছেন অনেক কিছু।সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা এমনিতেই নত হয়ে আসে।

প্রায় দেড় বছর যাবত বইটা হন্য হয়ে খুঁজেছিলাম।কোথাও বাদ রাখিনি।অবশেষে পড়ে মনে হয়েছে আমার এই পরিশ্রম সার্থক।

৫.হুমায়ূন আহমেদের অন্য অনেক গ্রামের মত '১৯৭১' উপন্যাসের গ্রামের নাম ও নীলগঞ্জ।একাত্তর সালে ছোট একটা গ্রামে মিলিটারি বাহিনীর আগমন,তাদের বর্বরতা, কিছু সাধারণ চরিত্র আর রহস্যময় এক রাজাকার রফিককে নিয়েই উপন্যাস।ঠিক বুঝে উঠা যায় না সে কি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে চায়?তাহলে পাকিস্তানী মেজর এজাজকে সাহায্য করে কেন?বরাবরের মতই চমৎকার।আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদের নিজের একটা গল্প কোন একভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।তাঁর নানা ছিলেন গ্রামের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।হুমায়ূন আহমেদের দাবী, স্রেফ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।এবং যুদ্ধের শেষে উনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। যদিও উপন্যাসে রফিক পাকিস্তানী মেজরের হাতে নিহত হয় বলেই মনে হয়।

এই বইটা হুমায়ূন আহমেদ উৎসর্গ করেছিলেন জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে।উপন্যাস পড়ার পরে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক হুমায়ূন আহমেদকে ডেকে পাঠান ও বলেন-আপনাকে ছোট্ট একটা উপদেশ দেওয়ার জন্যে ডেকেছি।আপনার লেখালেখি নিয়ে অনেকেই অনেক উপদেশ দিতে চেষ্টা করবে।আপনি কোন উপদেশই গুরুত্তের সঙ্গে বিবেচনা করবেন না।আপনার মনে যা আসে লিখবেন।ঠিক আছে?হুমায়ূন আহমেদ সে উপদেশ মনে রেখেছিলেন

***বলপয়েন্ট বইতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটা চ্যাপ্টার আছে।সেখান থেকেই নেওয়া

রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৩

বাবা দিবস ভাবনা -জোবায়ের আল মাহমুদ

বাবা দিবস ভাবনা //
ফেবুতে মা দিবস, বাবা দিবস নিয়ে যে তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি তা আমাকে অবাক করে! সমাজতাত্ত্বিক ভাবে দেখলে বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে পশ্চিমা আধুনিকতাবাদের প্রভাব মারাত্মক হলেও ধর্মীয় কালচার ও আবহমান বাংলার সামাজিক প্রথার প্রভাবের কারনে এখনও মা বাবার প্রতি আমাদের সম্পর্ক এতো মধুর, স্বাভাবিক যে তার জন্য আলাদা করে ঘটা করে দিবস পালন করে ভালবাসা প্রকাশের দরকার নেই! আমাদের সংস্কৃতিতে মা বাবার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের জন্য দিন উদযাপন তো রীতিমত সম্পর্কহীনতার বিচ্ছিন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, তাই সাধারণ মানুষের মাঝে এটা নিয়ে হৈ চৈ নেই, কিন্তু অনলাইনে শহুরে আধুনিকদের এতো আগ্রহ কেন? আমি মা দিবস কিংবা বাবা দিবসকে পশ্চিমা সমাজে আধুনিকতার সংকট থেকে উত্তরনের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক একটা উপায় হিসেবেই দেখি। পশ্চিমা আধুনিকতা প্রসূত মডার্ন লাইফস্টাইল যে অবাধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Over individualism), অনিয়ন্ত্রিত উদারতাবাদ (Liberalism), রি-ইফিকেশন (Reification) ও ডিসাবলিমেশন (Desublimation) এর জন্ম দেয় তার ফলে ক্রমেই তৈরি হয় মুক্তবাজার সংস্কৃতি ও কনজুমার কালচার যা পশ্চিমা সমাজের মানবিক সম্পর্কগুলোকে খুব দুর্বল করে তোলে। আধুনিকতা সর্বস্ব অবাধ মেটারিয়ালিস্ট লাইফ লিড করে বলেই পশ্চিমাদের মাঝে মোটা দাগে কিনশিপ দুর্বল হয়ে পড়ে, পারিবারিক সম্পর্কগুলো ভঙ্গুর হয়ে যায়, এই অবাধ ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক লাইফে এমনকি মা বাবার সাথে দূরত্ব কিংবা বিচ্ছেদ অথবা বিচ্ছিন্নতাও চরম আকার ধারণ করে। পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানবিক এই বন্ধনগুলোকে সুদৃঢ় করা এবং তার নিরিখেই মা দিবস কিংবা বাবা দিবসের উদযাপনের প্রচলন যার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দিবসের মাধ্যমে এই মানবিক সম্পর্কগুলোর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত উপযোগিতা মানুষের সামনে তুলে ধরা। যদিও পশ্চিমা সমাজের ভঙ্গুর সম্পর্ক জোড়াতালি দিতে এই দিবসের উপযোগিতা আমি সমর্থন করি কিন্তু মা বাবার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের এই দিবস উদযাপন পশ্চিমা সমাজের আধুনিক জীবনবোধের মাঝে বন্ধনহীনতার সঙ্কট আকারেই হাজির হয়েছে। আমরা মনে করি পশ্চিমা সমাজ শুধু দিবস উদযাপন করেই এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে না, অর্থনীতির জন্য কিংবা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের জন্য পশ্চিমের কাছে আমাদের যেমন যেতে হয় তেমনি পশ্চিমকেও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের জন্য প্রাচ্যের মানবিক বন্ধনের সংস্কৃতির অনুসঙ্গের কাছে আসতে হবে, আসতে বাধ্য;

মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৩

এশিয়ার সেরা শিক্ষাব্যবস্থা(যাঁতাকল)!

মঞ্জিল এক হলেও সেখানে পৌঁছাবার ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা থাকতে পারে।আগের লেখাতেই জানিয়েছিলাম  এক র‍্যাংকিং এ ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থাকেই পৃথিবীর সেরা শিক্ষাব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।এর পর পরেই রয়েছে সাউথ কোরিয়া।র‍্যাংকিং এ কাছাকাছি বলে এদের শিক্ষাব্যবস্থার ধরন যে একইরকম তেমনটা কিন্তু না বরং রীতিমত ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত বলা যায়।ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষাকে যতটাই অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়,সাউথ কোরিয়ায় তাকে তার চাইতে শতগুণ দরকারি মনে করা হয়।এরা পরীক্ষাকে কি পরিমাণ গুরুত্ব দেয়,তার একটা নজির দেওয়া যাক।বড় পাবলিক পরীক্ষাগুলো চলাকালীন সপ্তাহগুলোতে অফিস টাইম পরিবর্তন করা হয়,রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম যাতে না থাকে সেজন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।কেউ যদি মনে করে তার কোন কারণে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি হবে তবে তাকে নেওয়ার জন্য পুলিশ কারের ও ব্যবস্থা থাকে।এমনকি প্লেনের শব্দের কারণে যাতে পরীক্ষার ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য হলের উপর দিয়ে যাতে প্লেন না যায় সে ব্যবস্থাও করা হয়!

১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ৭০% কোরিয়ানই ছিল নিরক্ষর।১৯৭০ সালে এদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ২০০ ডলার(এখন ৩২,১০০ ডলার)।তাই এরা ও ফিনল্যান্ডের মত নিজেদের  উন্নয়নের সব চাইতে কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও উন্নতিকে বেছে নেয়।তারা যে ভুল করেনি তার বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের পর থেকে সাউথ কোরিয়ার জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০,০০০%(এখন ১.১১৬ ট্রিলিয়ন) এবং এই মুহূর্তে সাউথ কোরিয়ার অর্থনীতি বিশ্বের ১৩তম বৃহত্তর অর্থনীতি!

সাউথ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে মানবিকতা আর সামাজিকতা শিখার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে  হাইস্কুলের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ধাপে মার্জিত আচরণ,সামাজিকতা,সমাজের উন্নতির জন্য ভাবনা করা,বৈশ্বিক নাগরিকত্ব,অন্যদেশের সংস্কৃতি সহ নানান বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়া হয়।প্রাইমারী স্কুলগুলোতে পড়ালেখার চাইতে আর্ট-মিউজিক-শারীরিক শিক্ষার উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়।
সাউথ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার সবচাইতে অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার।স্যামসাং কিংবা এলজি’র মত জায়ান্ট ইলেকট্রনিক পণ্যের নির্মাতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রচুর প্রয়োগ হবে এটাই স্বাভাবিক।প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবখানেই উচ্চগতির ইন্টারনেট কানেকশান আছে এবং ক্লাসগুলোতেও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই শিক্ষা দেওয়া হয়।কোরিয়ান সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই ডিজিটালাইজড করার কথা ভাবছে।এর ফলে যে কোন জায়গা থেকেই ডেস্কটপ,ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেটের মাধ্যমে ক্লাসরুমে সংযুক্ত হওয়া যাবে।EDUNET নামে ইন্টারনেটে শিক্ষাসহায়ক একটি সার্ভিস আছে যেখান থেকে পড়ালেখাসংক্রান্ত যে কোন সাহায্য নেওয়া যায়।এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবেই ডাটাবেজ রাখা হয় যেখান থেকে ছাত্র কিংবা অভিভাবক সকলেই যেন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।মূলত সবার কাছে শিক্ষার আলো সমানভাবে ছড়িয়ে দিতেই এই ব্যবস্থা।
তবে প্রযুক্তি একেবারে সহজলভ্য হলেও কোরিয়ার শিক্ষা খরচ অতিমাত্রায় বেশি।দেশের জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় হয় কেবল শিক্ষাখাতে।এবং অভিভাবকদের আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় হয় সন্তানদের পড়ালেখার পিছনে।ব্যয়ের এই অত্যধিক বোঝার কারণে বেশিরভাগ মা-বাবাই একটি বা দুটির বেশি সন্তান নেন না।টেকনোলজির এত ছড়াছড়ির পরেও এত শিক্ষাব্যয় কেন?কারণ কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৪ ভাগই স্কুলের পরে কোচিং সেন্টারগুলোতে যায়(যাকে কোরিয়াতে HAGWON বলে)।২০১০ সালে এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রতিটি শিক্ষার্থী বছরে প্রায় $২৬০০ এই কোচিং সেন্টারগুলোতে খরচ করে এবং এসব প্রাইভেট টিউটরেরা মিলিয়ন ডলার কামিয়ে নিচ্ছেন।এছাড়া রয়েছে সরকারী ইউনিভার্সিটির অপ্রতুলতা।এইসব ভার্সিটি গুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়।সন্তান কোথায় পড়ালেখা করে এটা একটা ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ যার কারণে বাবা মা’রাও সন্তানের পড়ালেখার পিছনে সর্বোচ্চ অর্থ-শ্রম ব্যয় করেন।
ফিনল্যান্ডের মত সাউথ কোরিয়াতে ও শিক্ষকতা বেশ প্রেস্টিজিয়াস জব।উচ্চ বেতন ও সামাজিক সম্মানের কারণে এই পেশা কোরিয়ান তরুণদের কাছে সবচাইতে আকাঙ্খিত।এখানেও সেই প্রতিযোগিতা। মোট আবেদনকারীর মাত্র ৫ শতাংশ চাকরি পান এবং এই চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার মাত্র ১ শতাংশ।শিক্ষকরাও প্রচুর শ্রম দেন ছাত্রদের পিছনে।তবে তাঁরা ফিনল্যান্ডের শিক্ষকদের মত যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করেন না।শিক্ষকরা ছাত্রদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনতে পারেন।কিন্তু শাস্তি প্রদানের জন্য তাঁরা অধিকারপ্রাপ্ত নন।এজন্য আলাদা বিভাগ আছে যারা কাউন্সেলিং-জরিমানা কিংবা অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এইসব সমস্যার নিষ্পত্তি করেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সাউথ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ব্যপকভাবে পরীক্ষার উপরে নির্ভরশীল।সারা বছর বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখতে হয় শিক্ষার্থীদেরকে।এবং এজন্য প্রচুর পড়াশোনাও করতে হয় তাদের।সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ক্লাস করে এরা আবার কোচিং সেন্টার গুলোতেও পড়তে যায়।এবং সেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত(কোথাও এর ও বেশি!) পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকে।এখানেই শেষ না।বাসায় ফিরে আবার হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হয় তাদের।অর্থাৎ দিনের প্রায় ১২-১৬ ঘন্টা সময় কেবল পড়ালেখার পিছনেই ব্যয় করতে হয়।ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা যেখানে দিনে প্রায় ৭৫ মিনিট সময় পায় একেবারে মুক্ত থাকার সেখানে কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের ভরসা কেবল এক ক্লাসের শেষে অন্য ক্লাস শুরু হওয়ার জন্য যে ১০ মিনিট সময় থাকে কেবল সেটা।বছরে ২২০ দিন স্কুলের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়।তবে কোরিয়ান শিক্ষাব্যবস্থায় যত বেশি না ক্রিয়েটিভিটির উপর জোর দেওয়া হয় তার চাইতে বেশি জোর দেওয়া হয় মুখস্থ করার উপরে এবং পরীক্ষায় তা পারফর্ম করার উপরে।

এই যে এত পড়াশোনার চাপ-ব্যস্ততা কিংবা ‘EXAM-HELL’ এই সব কিছু নিয়ে কেমন আছে কোরিয়ান শিক্ষার্থীরা?বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে অসুখী শিশু হচ্ছে সাউথ কোরিয়ান শিশুরা।কারো কারো কাছে এই চাপ এতটা অসহনীয় যে তারা আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেয়।এমনিতে বিশ্বের Suicide Capital  হিসেবে সাউথ কোরিয়ার কুখ্যাতি আছে।প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করে পুরো সাউথ কোরিয়া জুড়ে।বলাই বাহুল্য,এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যকই হচ্ছে শিক্ষার্থী।২০০৯ সালে চালানো এক জরিপে জানা গিয়েছিল স্কুলগামী ৯% শিশুই কোন না কোন একসময় আত্মহত্যার কথা ভেবেছে।সবচাইতে বেশি সংখ্যক আত্মহত্যার পিছনে Bullying বা সহপাঠীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপই দায়ী বলে জানা গেছে।মার্চ ২০১৩ তে সম্পন্ন এক সার্ভেতে দেখা যাচ্ছে প্রতি দুইজনের একজন আত্মহত্যাকারী এই Bullying এর শিকার হয়েই এই আত্মহননের রাস্তা বেছে নিয়েছেন।এমন করুন দশার কারণে কোরিয়ান শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে যারা কিনা রাত দশটার পরে কোন HAGWON খোলা থাকে কিনা বা কোন শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান করে কিনা তা নজরদারি করে এবং ব্যবস্থা নেয়।

সব মিলিয়ে যখন এমন একটা অবস্থা তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক অবামা সাউথ কোরিয়ান শিক্ষাব্যবস্থার অভাবনীয় সাফল্য দেখে প্রশংসা করে বলেছেন,এমন ব্যবস্থা ইউএসএ তে চালু করা যায় কিনা তা ভেবে দেখবেন।কিন্তু এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন উন্নত দেশগুলো ভাবছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নামে এমন যাঁতাকল থেকে বের করে ইউরোপীয় কিংবা ইউএসএ’র মত আনন্দ-স্কুল টাইপ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে।আমার কেবল একটা কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে -বেড়ার ওইপাশের ঘাস সবসময়ই সবুজ মনে হয়!
পুনশ্চঃ
১.আগের লেখাতেও বলেছি এবং এখানেও আমরা দেখলাম দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শিক্ষাখাতে জিডিপির উল্লেখ্যযোগ্য অংশ ব্যয়ের কোন বিকল্প নেই।কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমেছে এবং ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে এর অবস্থান এখন চার।অথচ শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার একটা ট্রেন্ড মরহুম এম সাইফুর রহমান চালু করে গিয়েছিলেন এবং সেটা ধরে রাখা খুব একটা কঠিন কিছু ছিল না। এখন আর দলাদলির সময় নেই।একটা সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধে জর্জরিত ছিল এবং বাংলাদেশের পিছনে থাকলে ও তারা এখন আমাদের ছাড়িয়ে চলে গেছে।তাদের শিক্ষার হার ৯০ শতাংশ বিধায় তারা যেখানেই হাত দেয়,সেখানেই সোনা ফলে।আমাদের নীতিনির্ধারকরা এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন বলে আশা করি।
২.শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আর কোন লেখা লিখবার পরিকল্পনা না থাকলেও এই লেখাটা লিখবার অন্য একটা কারণ আছে।সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আমাদের বাবা-মা’রা সন্তানদেরকে যেভাবে দিনভর অবিরত শিক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে কি হতে পারে তার একটা নমুনা হিসেবেই এই লেখার অবতারণা।সাফল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ,কিন্তু যে সাফল্য অনেক মূল্য নেয় তা কি আসলেই খুব জরুরি?আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো যে স্টিম রোলার চালানো শুরু করেছে তা লং টার্মে কিসে রূপান্তরিত হতে পারে সেটা সাউথ কোরিয়ার চাইতে আর কেউ ভালো জানেনা।এর সাথে যুক্ত আছে সহপাঠিদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ আর বাবা-মা’র অন্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা-গঞ্জনা।এবং আমি আশংকা করছি ‘অদূর ভবিষ্যতে পড়ার চাপ সইতে না পেরে শিশুর আত্মহত্যা’ এমন শিরোনাম হয়তো পত্রিকার পাতায় দেখতে হতে পারে।অসীম করুণাময় আল্লাহ যেন আমার আশংকাকে মিথ্যা প্রমাণ করে।
সবাইকে ধন্যবাদ।
http://rdbangla.blogspot.com/2013/06/blog-post_8.html