সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

এভাবে কি মুসলিম নারী হেফাজত করা যায়?

গতকাল সন্ধ্যায় ফেসবুকে লগইন করতেই দেখি কেবল তেঁতুল আর তেঁতুল :thinking: ঘটনা কি তলিয়ে দেখতেই দেখি এক ভিডিওর কারণে এত মাতামাতি।
আল্লামা শাহ আহমেদ শফির এক বক্তব্যের কারণে এত সমালোচনা।বিতর্কিত সেই বক্তব্যের উল্লেখ্যযোগ্য অংশ হলঃ
* আপনি স্বামীর ঘরের মধ্যে থাইকা উনার আসবাব পত্র এগুলার হেফাজত করবেন।
* জেনা কইরা টাকা কামাই করতেসে, বরকত থাকবে কেমনে?
* আপনারা মেয়েদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে লেখাপড়া করাইতেসেন। কেন করাইতেসেন? তাদের ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়াইবেন যাতে বিবাহ শাদী দিলে স্বামীর টাকা পয়সার হিসাব রাখতে পারে।
* যতই বুজুর্গ হন আপনার মনের মাঝে কু খেয়াল আইসা যাবে। কেউ যদি বলে মেয়ে মানুষ দেখলে আমার দিলের মাঝে লালা ঝরে না, তাহলে বলব তোমার ধ্বজভঙ্গ রোগ আছে। তোমার পুরুষত্ব নস্ট হয়া গেসে। তাই মহিলাদের দেখলে তোমার কু ভাব আসে না।
* “জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল হল পুরুষদের মরদ থাইকা খাসী কইরা ফেলা।
* পারলে চাইরটা পর্যন্ত বিবাহ করবা। খাওয়াইবো তো আল্লাহ। বার্থ কন্ট্রোল করবা না। এইটা বড় গুনাহের কাজ।”
এই অভিযোগ অনেকদিনের পুরাতন যে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী জলসা মাহফিলে নারী প্রসঙ্গ আসলেই নানাভাবে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সম্বলিত কথা শোনা যায়।নারীকে কেবল শুনানো হয় পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা।কিন্তু সমাজ তাকে বিনিময়ে কি দিবে এবং সেগুলোর প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপই দেখা যায় না।এইসব ব্যাপার সামনে এনেই দাবী করা হয় ইসলাম নারী বান্ধব নয়।কিন্তু আসলেই কি তাই?বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণের সময়-সুযোগ না থাকলেও চেষ্টা করলাম কেবল আল্লামা শাহ আহমেদ শফির উপরোক্ত দাবী খন্ডনের।
রাসূলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেন,তোমাদের যে কারো যদি তিনজন কন্যা বা বোন থাকে আর সে তাদের সুন্দরমত দেখাশুনা করে,তবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।(তিরমিযী)
তেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাঃ আরো ইরশাদ করেছেন,তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।(তিরমিযী)
হুজুর কিভাবে নারীরে দমন করা যায়,তার ব্যাপারে এতকাল শিখিয়ে এসেছেন।কিন্তু ইসলাম নারীকে কি মর্যাদা দিল, সেটা কেন শোনান নাই?নারী স্বামীর আসবাব আর টাকা পয়সার হেফাজত করবে কিন্তু নারীর অধিকারের হেফাজত হবে কিভাবে,সেইটা কেন বললেন না?নারীরে প্রাপ্য বুঝিয়ে না দিলে আল্লাহ কি শাস্তি দিবেন,সেইটা কেন ওয়াজ-বয়ানে বলেন না??মেয়েরা যদি ক্লাস ফোর ফাইভ পর্যন্তই পড়ে,চিকিৎসক না হয় তাহলে ঘরের মা-বোন-কন্যা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে কার কাছে যাবে?কিংবা ঐ ফোর ফাইভ পর্যন্তই বা কার কাছে পড়বে?যেহেতু আমাদের পুরুষদের বুজুর্গ হলেও নারী দেখলে ‘লালা ঝরে’,সেহেতু দুনিয়ার কোন নারীই আমাদের কাছে নিরাপদ না।কি বলেন?তাহলে আর চোখের-গোপনাঙ্গের হেফাজতের আয়াত-হাদিস বর্ণনা করা কেন?
বার্থ কন্ট্রোল এমন একটা ইস্যু যেটার ব্যাপারে আমার জানামতে এখন পর্যন্ত ইসলামে কোন ফাইনাল ডিসিশন নাই।তবে দারিদ্র্যের ভয়ে কেউ যাতে সন্তান হত্যা না করে সে ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কঠোর নির্দেশনা আছে।রিজিকের মালিক অবশ্যই আল্লাহ,তবে উনি আমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর সময় আমার মাথায় ‘মগজ’ নামে একটা জিনিস ও ঢুকিয়ে দিয়েছেন।আপনি হয়তো রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করতে পারেন,কিন্তু ঐচ্ছিক জন্মনিয়ন্ত্রণ এর না।
ইসলাম কেন চারটা পর্যন্ত বিবাহের নির্দেশ কেন দিয়েছে সেটার কিছু কন্টেক্সট আছে।কারো মনে চাইল আর ধুম করে গিয়ে বিয়ে করে ফেলল-ব্যাপারটা তেমন না।যে আয়াতে আল্লাহ চার বিয়ের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন,তার শেষে এই লাইনটা ও আছে, ‘আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না,তবে একটি…’(সূরা নিসাঃ৩)
আবার তাদের মধ্যে যে শতভাগ সমতা রক্ষা যে অসম্ভব সে কথা ও বলে দিয়েছেন আল্লাহ।ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা যতই কামনা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে কখনো পারবে না।সুতরাং তোমরা (একজনের প্রতি) সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড় না…(সূরা নিসাঃ১২৯)
হুজুর আল্লাহর ওয়াস্তে তথ্য সন্ত্রাস করবেন না।আমরা মুসলিমরা এমনেই অনেক প্যারার মধ্যে আছি।আপনারা যদি নতুন করে এইসব রসালো কথাবার্তা বয়ান হিসেবে দেন,তখন আমাদের কাছে অসহায় মনে হয়,বিপন্ন মনে হয়।ইসলামের আবির্ভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে,সে পুরোহিতবাদ ঠেকিয়ে দিয়েছে।কিন্তু আপনাদের অবস্থা দেখলে মনে হয়,আপনারা সেটা আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
আল্লাহ সকলের মঙ্গল করুক

সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৩

ছোট্ট গ্রামের যান্ত্রিকতার ১৫০ বছর

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়,আমার বড় খালা তখন ২০-২২ বছরের এক বিবাহিতা তরুণী।১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হওয়াতে ইতিমধ্যেই এক ছেলে-এক মেয়ের মা।বড় খালু তখন শেল পেট্রোলিয়ামের চাকুরে।চট্টগ্রামে মোটামুটি ঝুটঝামেলা বিহীন একটা নিরুপদ্রব জীবন।কিন্তু যে-ই না যুদ্ধ শুরু হল,তখন আমার খালা-খালুর অকুল পাথারে পড়ার দশা।চট্টগ্রামে আপনজন বলতে কেউ নাই।নিরাপদ আশ্রয় মানে কেবলই নোয়াখালী।কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে সেখানে যাওয়াটা আর নিজের মাথা গিলোটীনে পেতে দেওয়া একই কথা।এমন সময় যেন দেবদূত হয়ে এলেন উনাদের পাশের ফ্ল্যাটেরই বাসিন্দা মহিলা।তিনিই প্রস্তাব করলেন,তাঁর সাথে বাবার বাড়ি বাঁশখালি যাওয়ার।মাত্র বছরখানেকের পরিচয়ে এক তরুণীকে এই মহিলা কেন এমন বড়বোনের স্নেহে নিজ বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সেটাই এক রহস্য।যেহেতু অন্য কোন উপায় ছিল না,আমার বড় খালা তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে এক রাতে রওনা হলেন সেই মহিলার পরিবারের সাথে।বিশাল এক ছইওয়ালা নৌকায় তিনদিনের ভয়ার্ত এক ভ্রমণের পর পৌঁছালেন বাঁশখালি।সেই বাড়িতেই এক সম্মানিত অতিথি হিসেবে আমার খালা ছিলেন প্রায় দুই মাস।নিজের আপনজনের দুশ্চিন্তা যাতে খালার মাথায় ভর না করে কিংবা কখনোই যেন এই বাড়িকে পরের বাড়ি মনে না হয় সেজন্য সেজন্য এই দুইমাসে পুঁথিপাঠের আসর,লাঠিখেলা,যাত্রাপালা সহ নানা স্থানীয়-লোকজ আয়োজনে সময়টাকে আনন্দময় করে রেখেছিল তারা।পরে যুদ্ধের প্রচন্ডতা কিছুটা কমতেই নোয়াখালি ফেরত গিয়েছিলেন আমার খালা।খালা যেদিন বিদায় নিচ্ছিলেন সেই বাড়ি থেকে,সেদিন শুধু খালার সম্মানার্থেই আয়োজন করা হয়েছিল এক ফিস্টের।আমার দুই খালাত ভাই বোনের হাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল তখনকার ১০+১০=২০ টাকা।
শুনতে কিছুটা অস্বস্তিকর যে সারা দেশ যখন পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্তির জন্য পাগলপারা হয়ে আছে তখন একটা পরিবার আনন্দ-ফুর্তির মধ্যে সময় কাটাচ্ছে।কিন্তু আমার কাছে এর একটা অন্য মানেও আছে।কারো মনের দুশ্চিন্তা দূর করতে এমন প্রাণান্ত চেষ্টা মানুষের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে।চট্টগ্রামের মানুষগুলোই হয়তোবা এমন!আমার নিজের অভিজ্ঞতা ও এমনটাই বলে।আমার কেন জানি মনে হয়,কোন জায়গার ভৌগলিক অবস্থানের সাথে সে এলাকার মানুষের মন-মানসিকতার কোন একটা যোগসূত্র থাকে।চট্টগ্রামে পাহাড় আর সাগর আছে বলেই হয়তো কে জানে এখানকার মানুষগুলোর আচরণ ও বোধহয় অন্যরকম উদার।আপাতদৃষ্টিতে এখানকার মানুষের ভাষা-ব্যবহার কর্কশ মনে হলেও এরা কাউকে যদি একবার পছন্দ করে,তবে তার জন্য হয়তো জীবন ও দিতে পারবে।অনেকটা মুখে বিষ,অন্তরে মধু টাইপ অবস্থা! মানুষকে বিশ্বাস করার অবিশ্বাস্য একটা ক্ষমতা আছে এদের মধ্যে।মাত্র কয়েক বছর আগেও কোটি কোটি টাকার ব্যবসা কেবল মৌখিক কথা আর বিশ্বাস এর উপরেই করতেন খাতুনগঞ্জ-আসাদগঞ্জ এর পাইকারি ব্যবসায়ীরা।চাঁটগাবাসীর অতিথি আপ্যায়ন আর ভোজনবিলাসিতার সুনাম তো সারাদেশ জুড়েই বিস্তৃত।আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়,চিটাগং এর মানুষের পারিবারিক বন্ধন।সারা পৃথিবী জুড়ে যেখানে একক পরিবারের সংখ্যা কিংবা জনপ্রিয়তা বাড়ছে,সেখানে চিটাগং দেখবেন যৌথ পরিবারের প্রাণচাঞ্চল্য!এই বন্ধন কতটা দৃঢ় আর শক্তিশালী সেটা বুঝার জন্য চিটাগং এর কোন সামাজিক-পারিবারিক অনুষ্ঠানে আসলেই বুঝবেন।চাচাত কিংবা অন্য সব দূরের আত্মীয়ের সাথে এদের যে হৃদ্যতা,সেটা অনেক স্থানের আপন ভাই বোনের মধ্যেও আপনি কল্পনা করতে পারবেন না।
মানুষগুলো এমন বিশ্বাসী, চমৎকার আর প্রাণখোলা বলেই হয়তো চট্টগ্রামের উন্নয়ন হয়না।দেশের অর্থনীতির বেশ উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নির্ভরশীল হলেও এর আয়ের খুব ছোট একটা অংশই খরচ হয় এখানে।নামকাওয়াস্তে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’!ঢাকা নিয়ে যত জল্পনা- কল্পনা তার অর্ধেকটা যদি এই সবুজ শহরকে নিয়ে হতো,তাহলে দেশের অবস্থাটা ও হয়তো অন্য রকম হতো।ছোটবেলা থেকে যে চট্টগ্রামকে দেখতে দেখতে বড় হচ্ছি,সেটা কেমন জানি বদলে যাচ্ছে।প্রচুর মানুষ,ট্রাফিক জ্যাম,ক্রমক্ষয়িষ্ণু সবুজ,যত্রতত্র নোংরা আবর্জনা এইসব মিলিয়ে একটা প্রাণউচ্ছল শহর কেমন জানি ধুসর হয়ে যাচ্ছে।তারপরেও এই শহরটা কেমন জানি মায়াবতী টাইপ।পাহাড়-নদী-সাগরের এই শহরে কখনো মন খারাপ হয় না!কখনো যদি শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হয়,মনটা যেন কেমন করে।সিটিগেইট যখন পিছনে ফেলে আসি,মনে হয় কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি।কে জানে,নিজের শহর নিয়ে সবার অনুভূতিটাই হয়তো এমন।তা না হলে পৈতৃকবাড়ি নোয়াখালী আর সিলেটের কোম্পানিগঞ্জের পুলিশ কোয়ার্টারে জন্মানো একটা ছেলের চিটাগং নিয়ে এমন অনুভূতি থাকবে কেন?
পুনশ্চঃবিনা হেতুতে এত কিছু লেখার কারণ আমার প্রিয় এই নগরীর সিটি করপরেশান ১৫০ বছরে পা দিয়েছে।১৮৬৩ সালে মাত্র চারটা ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি এখন ৪১ ওয়ার্ডের চট্টগ্রাম সিটি করপরেশান।একটা মফঃস্বল শহর যখন পৌরসভা বা সিটি করপরেশানএ রূপ নেয় তখন আমার মনে হয় এর মধ্যে যান্ত্রিকতার আমদানি হয়।আর ধারণা করা হয় ছোট্ট গ্রাম থেকেই চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব!

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৩

বইয়ের পোকা গ্রুপে পোস্ট

১.অনীশ দাস অপুরে মূলত চিনি তাঁর হরর গল্পের জন্য।অসাধারণ সব গা-হিম করা গল্প লিখেন।সেবা প্রকাশনীর একরকম সমার্থক হয়ে গেছেন বলা যায়।সেবা প্রকাশনী থেকে যেসব গল্পসংকলন বের হয় তার বেশিরভাগই উনার সম্পাদনায় বের হয়।এর আগে পড়েছিলাম হিচ-হাইকার।আর এবার পড়লাম "অতল পৃথিবী"।এই বইয়ের উপর মন্তব্য করা মানে শব্দের অপচয়!
একেকটা থেকে একেকটা গল্প এত অসাধারণ।এই বইয়েই একদম নতুন কিছু লেখকের নাম জানলাম যাদের নাম আগে কখনোই শুনিনি(আমি এমনেতেও অনেকের যে নাম জানি তেমনটা না!)।
অতিরিক্ত ভালো লাগার গল্পগুলোর নাম বলে যাই।টাইটেল গল্প "অতল পৃথিবী" জুল ভার্নের লেখা।জুল ভার্নের মাথাটা সংরক্ষণ করা খুব জরুরি ছিল।এমন লেখা কিংবা এমন ভাবনা এই লোক কিভাবে করতেন গবেষণা হওয়া দরকার।গল্পটা পড়ার পরে আমি নিজেও অতল ভাবনায় হারিয়ে গেলাম।মাথা চুলকাই আর ভাবি কোথা থেকে আসলাম আর কোথায় যাব!

ও' হেনরির 'বিশ বছর পর' গল্পের শেষটা পড়ে চমকে গেছি বলা যায়।হেলেন নেলসনের এর 'সাক্ষী ' কিংবা উইলিয়াম এফ নোলান এর হরর সায়েন্স ফিকশনটা বেশ ছিল।

যেহেতু সেবা প্রকাশনীর বই সেহেতু গোয়েন্দা গল্প বাছাইয়ে ভালো নজর থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।স্যার আরথার কোনান ডায়েলের শারলক হোমস সিরিজের একটা গল্প আছে।আছে বিশ্ববিখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচককের ঘড়ি রহস্য নিয়ে চমৎকার একটা গল্প।আগাথা ক্রিস্টির ও 'ভয়' নামে অন্য রকম একটা গল্প আছে।পুরো বইটাই অসাধারণ।আর অনুবাদকদের কথা না বললেই নয়।বাংলাদেশের সবচাইতে সেরা সব অনুবাদক নিয়ে সম্ভবত সেবা প্রকাশনী বসে আছে।তাদের সবার জন্য (y)

পরবর্তী সংকলন 'ঘাতক সময়' পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

২.ভবিষ্যৎবাণী করার ব্যাপারে আমি খুব একটা অভিজ্ঞ না হলেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি বাংলাদেশের থ্রিলার লেখালেখির জগতে দিকপাল হয়ে উঠবেন মাশুদুল হক।অসাধারণ লিখেন।তার ভেন্ট্রাকুইলিস্ট পড়লাম।বেশ চমৎকার।থ্রিলার পড়ি না অনেকদিন।তবে এই বইটা পড়ে থ্রিলারের জন্য পুরাতন ভালোবাসা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো :D বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে সরাসরি তুলে দেই।

বিয়ের অনুষ্ঠানে অনেকদিন পর দেখা হয়ে যায় পুরনো বন্ধুদের, দুই বন্ধু নৃতাত্ত্বিক মারুফ এবং পত্রিকার ফিচার এডিটর রুমি কথা প্রসঙ্গে জানতে পারে তাদেরই আরেক বন্ধু পেশা হিসেবে নিয়েছে ভেন্ট্রিলোকুইজম। কৌতূহলী হয়ে সেটার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ওরা জড়িয়ে পড়ে দারুণ রহস্যময় এক অনুসন্ধানে, বেরিয়ে আসে ভয়ংকর আর শিউরে উঠবার মত সব সত্য, সাধারণ মানুষকে কখনোই জানতে দেয়া হয় না এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক সম্প্রদায়ের কথা। যার পদে পদে ওদের জন্য ওৎ পেতে আছে মৃত্যুগামী বিপদ, অভাবনীয় বিস্ময়, জড়িত আছে ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষের জীবন, এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র । ভেন্ট্রিলোকুইস্ট শুধু একটি উপন্যাসই নয়, পাঠকদের জন্য ইতিহাস, স্থাপত্য, গণিত, ধর্মতত্ত্ব আর বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব যাত্রা।

***বইয়ে ব্যবহৃত সবগুলো ফ্যাক্টই দালিলিক ভাবে প্রমাণিত

৩.মাহবুব মোর্শেদের প্রবন্ধ কিংবা পলিটিক্যাল লেখা পড়লেও কোন গল্প-উপন্যাস আগে কখনো পড়া হয়নি।ইদানীং কেন জানি গল্প-উপন্যাস ও আর ওইভাবে ভালো লাগে না।টাইম পাসের জন্য পড়া অনেকটা।কিন্তু 'ফেস বাই ফেস' উপন্যাস পড়ে বেশ চমৎকার লাগলো।ভিন্ন টেস্টের।প্রতিদিনের ফেসবুক জীবন আর তার সাথে বাস্তব জীবনের সংশ্রব নিয়েই বইটা।শহরবাসী মধ্যবিত্তের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বই।বইয়ের প্রায় শেষদিকে একটা চমক আছে।নানা শারীরিক অন্তরঙ্গতার কথা গল্প-উপন্যাসে থাকে কিন্তু এই বইয়ের শেষদিকে যে চমকটা আছে সেটা আমি অন্তত আমার পড়া অন্য কোন বাংলা বইতে পাইনি।বইয়ের মত বইয়ের রিভিউটাও ভালোই লিখেছেন সালাহউদ্দিন শুভ্র।বইটি ফ্রি ডাউনলোড করার জন্য ক্লিক করুনhttp://www.boierdokan.com/uploads/9/2/4/3/9243378/face_by_face.pdf

৪.পড়ছেন বই কিন্তু মনে হবে কথোপকথন শুনছেন!একজন প্রমিত ভাষায় চমৎকার সব প্রশ্ন করে যাচ্ছেন আর বয়স্ক একজন ভদ্রলোক সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন ঢাকাইয়া বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে।পাশ থেকে আরেক ভদ্রলোক টুকটাক সম্পূরক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন।বইটা যারা পড়েছেন তারা ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন বইটা হচ্ছে সরদার ফজলুল করিমের 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ-অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে আলাপচারিতা'।এত চমৎকার একটা বই।লেখকের মুন্সিয়ানার কারণে মনে হবে জলজ্যান্ত তিনজন মানুষ আপনার সামনে বসেই কথা বলছেন।এই আলাপচারিতাতে উঠে এসেছে ১৯ শতকের পূর্ববাংলার মুসলিম সমাজের কথা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোঁড়ার দিকের কথা,তার বিকাশ,সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা সহ আর ও অনেক কিছু।এমন এক অধ্যাপকের পরিচয় পাবেন যিনি সারা জীবন কেবল জ্ঞানসাধনা করে গেছেন।কোন অন্যায়এর সাথে আপোষ করেননি।বইয়ের শেষদিকে আছে আরেক জ্ঞানতাপস অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেনের সাথে আলাপচারিতা।তিনি তখন অনেক বয়স্ক।স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এমন একটা অবস্থা।তারপরেও জানিয়েছেন অনেক কিছু।সেই সময়ের শিক্ষকদের কথা পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা এমনিতেই নত হয়ে আসে।

প্রায় দেড় বছর যাবত বইটা হন্য হয়ে খুঁজেছিলাম।কোথাও বাদ রাখিনি।অবশেষে পড়ে মনে হয়েছে আমার এই পরিশ্রম সার্থক।

৫.হুমায়ূন আহমেদের অন্য অনেক গ্রামের মত '১৯৭১' উপন্যাসের গ্রামের নাম ও নীলগঞ্জ।একাত্তর সালে ছোট একটা গ্রামে মিলিটারি বাহিনীর আগমন,তাদের বর্বরতা, কিছু সাধারণ চরিত্র আর রহস্যময় এক রাজাকার রফিককে নিয়েই উপন্যাস।ঠিক বুঝে উঠা যায় না সে কি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে চায়?তাহলে পাকিস্তানী মেজর এজাজকে সাহায্য করে কেন?বরাবরের মতই চমৎকার।আমার ধারণা, হুমায়ূন আহমেদের নিজের একটা গল্প কোন একভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।তাঁর নানা ছিলেন গ্রামের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।হুমায়ূন আহমেদের দাবী, স্রেফ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।এবং যুদ্ধের শেষে উনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। যদিও উপন্যাসে রফিক পাকিস্তানী মেজরের হাতে নিহত হয় বলেই মনে হয়।

এই বইটা হুমায়ূন আহমেদ উৎসর্গ করেছিলেন জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে।উপন্যাস পড়ার পরে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক হুমায়ূন আহমেদকে ডেকে পাঠান ও বলেন-আপনাকে ছোট্ট একটা উপদেশ দেওয়ার জন্যে ডেকেছি।আপনার লেখালেখি নিয়ে অনেকেই অনেক উপদেশ দিতে চেষ্টা করবে।আপনি কোন উপদেশই গুরুত্তের সঙ্গে বিবেচনা করবেন না।আপনার মনে যা আসে লিখবেন।ঠিক আছে?হুমায়ূন আহমেদ সে উপদেশ মনে রেখেছিলেন

***বলপয়েন্ট বইতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটা চ্যাপ্টার আছে।সেখান থেকেই নেওয়া

রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৩

বাবা দিবস ভাবনা -জোবায়ের আল মাহমুদ

বাবা দিবস ভাবনা //
ফেবুতে মা দিবস, বাবা দিবস নিয়ে যে তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি তা আমাকে অবাক করে! সমাজতাত্ত্বিক ভাবে দেখলে বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে পশ্চিমা আধুনিকতাবাদের প্রভাব মারাত্মক হলেও ধর্মীয় কালচার ও আবহমান বাংলার সামাজিক প্রথার প্রভাবের কারনে এখনও মা বাবার প্রতি আমাদের সম্পর্ক এতো মধুর, স্বাভাবিক যে তার জন্য আলাদা করে ঘটা করে দিবস পালন করে ভালবাসা প্রকাশের দরকার নেই! আমাদের সংস্কৃতিতে মা বাবার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের জন্য দিন উদযাপন তো রীতিমত সম্পর্কহীনতার বিচ্ছিন্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, তাই সাধারণ মানুষের মাঝে এটা নিয়ে হৈ চৈ নেই, কিন্তু অনলাইনে শহুরে আধুনিকদের এতো আগ্রহ কেন? আমি মা দিবস কিংবা বাবা দিবসকে পশ্চিমা সমাজে আধুনিকতার সংকট থেকে উত্তরনের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক একটা উপায় হিসেবেই দেখি। পশ্চিমা আধুনিকতা প্রসূত মডার্ন লাইফস্টাইল যে অবাধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (Over individualism), অনিয়ন্ত্রিত উদারতাবাদ (Liberalism), রি-ইফিকেশন (Reification) ও ডিসাবলিমেশন (Desublimation) এর জন্ম দেয় তার ফলে ক্রমেই তৈরি হয় মুক্তবাজার সংস্কৃতি ও কনজুমার কালচার যা পশ্চিমা সমাজের মানবিক সম্পর্কগুলোকে খুব দুর্বল করে তোলে। আধুনিকতা সর্বস্ব অবাধ মেটারিয়ালিস্ট লাইফ লিড করে বলেই পশ্চিমাদের মাঝে মোটা দাগে কিনশিপ দুর্বল হয়ে পড়ে, পারিবারিক সম্পর্কগুলো ভঙ্গুর হয়ে যায়, এই অবাধ ইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক লাইফে এমনকি মা বাবার সাথে দূরত্ব কিংবা বিচ্ছেদ অথবা বিচ্ছিন্নতাও চরম আকার ধারণ করে। পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিজ্ঞানীদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানবিক এই বন্ধনগুলোকে সুদৃঢ় করা এবং তার নিরিখেই মা দিবস কিংবা বাবা দিবসের উদযাপনের প্রচলন যার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই দিবসের মাধ্যমে এই মানবিক সম্পর্কগুলোর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত উপযোগিতা মানুষের সামনে তুলে ধরা। যদিও পশ্চিমা সমাজের ভঙ্গুর সম্পর্ক জোড়াতালি দিতে এই দিবসের উপযোগিতা আমি সমর্থন করি কিন্তু মা বাবার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের এই দিবস উদযাপন পশ্চিমা সমাজের আধুনিক জীবনবোধের মাঝে বন্ধনহীনতার সঙ্কট আকারেই হাজির হয়েছে। আমরা মনে করি পশ্চিমা সমাজ শুধু দিবস উদযাপন করেই এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে না, অর্থনীতির জন্য কিংবা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের জন্য পশ্চিমের কাছে আমাদের যেমন যেতে হয় তেমনি পশ্চিমকেও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের জন্য প্রাচ্যের মানবিক বন্ধনের সংস্কৃতির অনুসঙ্গের কাছে আসতে হবে, আসতে বাধ্য;

মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৩

এশিয়ার সেরা শিক্ষাব্যবস্থা(যাঁতাকল)!

মঞ্জিল এক হলেও সেখানে পৌঁছাবার ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা থাকতে পারে।আগের লেখাতেই জানিয়েছিলাম  এক র‍্যাংকিং এ ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থাকেই পৃথিবীর সেরা শিক্ষাব্যবস্থা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।এর পর পরেই রয়েছে সাউথ কোরিয়া।র‍্যাংকিং এ কাছাকাছি বলে এদের শিক্ষাব্যবস্থার ধরন যে একইরকম তেমনটা কিন্তু না বরং রীতিমত ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত বলা যায়।ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষাকে যতটাই অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়,সাউথ কোরিয়ায় তাকে তার চাইতে শতগুণ দরকারি মনে করা হয়।এরা পরীক্ষাকে কি পরিমাণ গুরুত্ব দেয়,তার একটা নজির দেওয়া যাক।বড় পাবলিক পরীক্ষাগুলো চলাকালীন সপ্তাহগুলোতে অফিস টাইম পরিবর্তন করা হয়,রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম যাতে না থাকে সেজন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।কেউ যদি মনে করে তার কোন কারণে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি হবে তবে তাকে নেওয়ার জন্য পুলিশ কারের ও ব্যবস্থা থাকে।এমনকি প্লেনের শব্দের কারণে যাতে পরীক্ষার ব্যাঘাত না ঘটে সেজন্য হলের উপর দিয়ে যাতে প্লেন না যায় সে ব্যবস্থাও করা হয়!

১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ৭০% কোরিয়ানই ছিল নিরক্ষর।১৯৭০ সালে এদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ২০০ ডলার(এখন ৩২,১০০ ডলার)।তাই এরা ও ফিনল্যান্ডের মত নিজেদের  উন্নয়নের সব চাইতে কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও উন্নতিকে বেছে নেয়।তারা যে ভুল করেনি তার বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের পর থেকে সাউথ কোরিয়ার জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০,০০০%(এখন ১.১১৬ ট্রিলিয়ন) এবং এই মুহূর্তে সাউথ কোরিয়ার অর্থনীতি বিশ্বের ১৩তম বৃহত্তর অর্থনীতি!

সাউথ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে মানবিকতা আর সামাজিকতা শিখার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে  হাইস্কুলের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে ধাপে মার্জিত আচরণ,সামাজিকতা,সমাজের উন্নতির জন্য ভাবনা করা,বৈশ্বিক নাগরিকত্ব,অন্যদেশের সংস্কৃতি সহ নানান বিষয়ে সম্যক ধারণা দেওয়া হয়।প্রাইমারী স্কুলগুলোতে পড়ালেখার চাইতে আর্ট-মিউজিক-শারীরিক শিক্ষার উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়।
সাউথ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার সবচাইতে অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার।স্যামসাং কিংবা এলজি’র মত জায়ান্ট ইলেকট্রনিক পণ্যের নির্মাতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রচুর প্রয়োগ হবে এটাই স্বাভাবিক।প্রাইমারী স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবখানেই উচ্চগতির ইন্টারনেট কানেকশান আছে এবং ক্লাসগুলোতেও প্রযুক্তি ব্যবহার করেই শিক্ষা দেওয়া হয়।কোরিয়ান সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই ডিজিটালাইজড করার কথা ভাবছে।এর ফলে যে কোন জায়গা থেকেই ডেস্কটপ,ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবলেটের মাধ্যমে ক্লাসরুমে সংযুক্ত হওয়া যাবে।EDUNET নামে ইন্টারনেটে শিক্ষাসহায়ক একটি সার্ভিস আছে যেখান থেকে পড়ালেখাসংক্রান্ত যে কোন সাহায্য নেওয়া যায়।এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবেই ডাটাবেজ রাখা হয় যেখান থেকে ছাত্র কিংবা অভিভাবক সকলেই যেন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।মূলত সবার কাছে শিক্ষার আলো সমানভাবে ছড়িয়ে দিতেই এই ব্যবস্থা।
তবে প্রযুক্তি একেবারে সহজলভ্য হলেও কোরিয়ার শিক্ষা খরচ অতিমাত্রায় বেশি।দেশের জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যয় হয় কেবল শিক্ষাখাতে।এবং অভিভাবকদের আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় হয় সন্তানদের পড়ালেখার পিছনে।ব্যয়ের এই অত্যধিক বোঝার কারণে বেশিরভাগ মা-বাবাই একটি বা দুটির বেশি সন্তান নেন না।টেকনোলজির এত ছড়াছড়ির পরেও এত শিক্ষাব্যয় কেন?কারণ কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৪ ভাগই স্কুলের পরে কোচিং সেন্টারগুলোতে যায়(যাকে কোরিয়াতে HAGWON বলে)।২০১০ সালে এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে প্রতিটি শিক্ষার্থী বছরে প্রায় $২৬০০ এই কোচিং সেন্টারগুলোতে খরচ করে এবং এসব প্রাইভেট টিউটরেরা মিলিয়ন ডলার কামিয়ে নিচ্ছেন।এছাড়া রয়েছে সরকারী ইউনিভার্সিটির অপ্রতুলতা।এইসব ভার্সিটি গুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়।সন্তান কোথায় পড়ালেখা করে এটা একটা ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ যার কারণে বাবা মা’রাও সন্তানের পড়ালেখার পিছনে সর্বোচ্চ অর্থ-শ্রম ব্যয় করেন।
ফিনল্যান্ডের মত সাউথ কোরিয়াতে ও শিক্ষকতা বেশ প্রেস্টিজিয়াস জব।উচ্চ বেতন ও সামাজিক সম্মানের কারণে এই পেশা কোরিয়ান তরুণদের কাছে সবচাইতে আকাঙ্খিত।এখানেও সেই প্রতিযোগিতা। মোট আবেদনকারীর মাত্র ৫ শতাংশ চাকরি পান এবং এই চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার মাত্র ১ শতাংশ।শিক্ষকরাও প্রচুর শ্রম দেন ছাত্রদের পিছনে।তবে তাঁরা ফিনল্যান্ডের শিক্ষকদের মত যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করেন না।শিক্ষকরা ছাত্রদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনতে পারেন।কিন্তু শাস্তি প্রদানের জন্য তাঁরা অধিকারপ্রাপ্ত নন।এজন্য আলাদা বিভাগ আছে যারা কাউন্সেলিং-জরিমানা কিংবা অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এইসব সমস্যার নিষ্পত্তি করেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সাউথ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ব্যপকভাবে পরীক্ষার উপরে নির্ভরশীল।সারা বছর বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখতে হয় শিক্ষার্থীদেরকে।এবং এজন্য প্রচুর পড়াশোনাও করতে হয় তাদের।সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ক্লাস করে এরা আবার কোচিং সেন্টার গুলোতেও পড়তে যায়।এবং সেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত(কোথাও এর ও বেশি!) পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকে।এখানেই শেষ না।বাসায় ফিরে আবার হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হয় তাদের।অর্থাৎ দিনের প্রায় ১২-১৬ ঘন্টা সময় কেবল পড়ালেখার পিছনেই ব্যয় করতে হয়।ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা যেখানে দিনে প্রায় ৭৫ মিনিট সময় পায় একেবারে মুক্ত থাকার সেখানে কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের ভরসা কেবল এক ক্লাসের শেষে অন্য ক্লাস শুরু হওয়ার জন্য যে ১০ মিনিট সময় থাকে কেবল সেটা।বছরে ২২০ দিন স্কুলের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়।তবে কোরিয়ান শিক্ষাব্যবস্থায় যত বেশি না ক্রিয়েটিভিটির উপর জোর দেওয়া হয় তার চাইতে বেশি জোর দেওয়া হয় মুখস্থ করার উপরে এবং পরীক্ষায় তা পারফর্ম করার উপরে।

এই যে এত পড়াশোনার চাপ-ব্যস্ততা কিংবা ‘EXAM-HELL’ এই সব কিছু নিয়ে কেমন আছে কোরিয়ান শিক্ষার্থীরা?বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচাইতে অসুখী শিশু হচ্ছে সাউথ কোরিয়ান শিশুরা।কারো কারো কাছে এই চাপ এতটা অসহনীয় যে তারা আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেয়।এমনিতে বিশ্বের Suicide Capital  হিসেবে সাউথ কোরিয়ার কুখ্যাতি আছে।প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন মানুষ আত্মহত্যা করে পুরো সাউথ কোরিয়া জুড়ে।বলাই বাহুল্য,এদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যকই হচ্ছে শিক্ষার্থী।২০০৯ সালে চালানো এক জরিপে জানা গিয়েছিল স্কুলগামী ৯% শিশুই কোন না কোন একসময় আত্মহত্যার কথা ভেবেছে।সবচাইতে বেশি সংখ্যক আত্মহত্যার পিছনে Bullying বা সহপাঠীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপই দায়ী বলে জানা গেছে।মার্চ ২০১৩ তে সম্পন্ন এক সার্ভেতে দেখা যাচ্ছে প্রতি দুইজনের একজন আত্মহত্যাকারী এই Bullying এর শিকার হয়েই এই আত্মহননের রাস্তা বেছে নিয়েছেন।এমন করুন দশার কারণে কোরিয়ান শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে যারা কিনা রাত দশটার পরে কোন HAGWON খোলা থাকে কিনা বা কোন শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান করে কিনা তা নজরদারি করে এবং ব্যবস্থা নেয়।

সব মিলিয়ে যখন এমন একটা অবস্থা তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক অবামা সাউথ কোরিয়ান শিক্ষাব্যবস্থার অভাবনীয় সাফল্য দেখে প্রশংসা করে বলেছেন,এমন ব্যবস্থা ইউএসএ তে চালু করা যায় কিনা তা ভেবে দেখবেন।কিন্তু এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন উন্নত দেশগুলো ভাবছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার নামে এমন যাঁতাকল থেকে বের করে ইউরোপীয় কিংবা ইউএসএ’র মত আনন্দ-স্কুল টাইপ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে।আমার কেবল একটা কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে -বেড়ার ওইপাশের ঘাস সবসময়ই সবুজ মনে হয়!
পুনশ্চঃ
১.আগের লেখাতেও বলেছি এবং এখানেও আমরা দেখলাম দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শিক্ষাখাতে জিডিপির উল্লেখ্যযোগ্য অংশ ব্যয়ের কোন বিকল্প নেই।কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল এবারের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমেছে এবং ব্যয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে এর অবস্থান এখন চার।অথচ শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার একটা ট্রেন্ড মরহুম এম সাইফুর রহমান চালু করে গিয়েছিলেন এবং সেটা ধরে রাখা খুব একটা কঠিন কিছু ছিল না। এখন আর দলাদলির সময় নেই।একটা সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধে জর্জরিত ছিল এবং বাংলাদেশের পিছনে থাকলে ও তারা এখন আমাদের ছাড়িয়ে চলে গেছে।তাদের শিক্ষার হার ৯০ শতাংশ বিধায় তারা যেখানেই হাত দেয়,সেখানেই সোনা ফলে।আমাদের নীতিনির্ধারকরা এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন বলে আশা করি।
২.শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আর কোন লেখা লিখবার পরিকল্পনা না থাকলেও এই লেখাটা লিখবার অন্য একটা কারণ আছে।সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আমাদের বাবা-মা’রা সন্তানদেরকে যেভাবে দিনভর অবিরত শিক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে কি হতে পারে তার একটা নমুনা হিসেবেই এই লেখার অবতারণা।সাফল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ,কিন্তু যে সাফল্য অনেক মূল্য নেয় তা কি আসলেই খুব জরুরি?আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো যে স্টিম রোলার চালানো শুরু করেছে তা লং টার্মে কিসে রূপান্তরিত হতে পারে সেটা সাউথ কোরিয়ার চাইতে আর কেউ ভালো জানেনা।এর সাথে যুক্ত আছে সহপাঠিদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ আর বাবা-মা’র অন্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা-গঞ্জনা।এবং আমি আশংকা করছি ‘অদূর ভবিষ্যতে পড়ার চাপ সইতে না পেরে শিশুর আত্মহত্যা’ এমন শিরোনাম হয়তো পত্রিকার পাতায় দেখতে হতে পারে।অসীম করুণাময় আল্লাহ যেন আমার আশংকাকে মিথ্যা প্রমাণ করে।
সবাইকে ধন্যবাদ।
http://rdbangla.blogspot.com/2013/06/blog-post_8.html